বৈদেশিক ঋণ

মাথাপিছু দায় ৯৫ ডলার বেড়েছে

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০৩ এএম

বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের দায় বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দায় বেড়েছে ৮৫১ কোটি ৮৪ লাখ (৮ দশমিক ৫১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। বহুপক্ষীয় (মাল্টিলেটারাল) ঋণ বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং দ্বিপক্ষীয় ঋণ বেড়েছে ১৩ শতাংশ হারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও ৭৫১ কোটি ৯১ লাখ ডলার ঋণ এসেছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সম্পন্ন হয়েছে।

পূর্ববর্তী পুঞ্জীভূত ঋণের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সমঝোতাকৃত ও ঋণদাতাদের বিতরণকৃত বৈদেশিক ঋণ যুক্ত হয়েছে ১ হাজার ৬০৩ কোটি বা ১৬ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের ১৭০ মিলিয়ন নাগরিকের মাথাপিছু নতুন দায় প্রায় ৯৫ ডলার (১১ হাজার ৬৮৫ টাকা)। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দেশের মোট পুঞ্জীভূত বৈদেশিক ঋণ ১১১ বিলিয়ন (১১ হাজার ১০০ কোটি) ডলার। এর মধ্যে সরকারের ঋণ রয়েছে প্রায় ৯১ বিলিয়ন (৯ হাজার ১০০ কোটি) ডলার। আর ২০ বিলিয়ন (দুই হাজার কোটি) ডলার বেসরকারি খাতের ঋণ। সে হিসেবে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের দায় এখন ৬৫৩ ডলার (৮০ হাজার ৩১৯ টাকা)। শুধু সরকারের ঋণ আমলে নিলে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের দায় ৫৩৫ দশমিক ২৯ ডলার বা ৬৫ হাজার ৮৪০ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে ওই দায় ছিল ৪৫৯ দশমিক ৮২ ডলার (৫৬ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা)।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশি ঋণের দায় ক্রমাগতভাবে বাড়ছে এবং অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার চলে গেলেও ঋণের দায়ভার থেকে যায়। দেশ ও জাতির প্রতি মমত্ববোধ থেকে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার বিষয়টি ভাবতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতির বিশ্লেষক ড. মুস্তফা কে মুজেরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যৌক্তিকভাবে বৈদেশিক ঋণ নেয়নি। ফলে বৈদেশিক ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

ড. মুজেরী বলেন, ‘আগেও মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল। যে সরকারই বৈদেশিক ঋণ নিক না কেন তা পরিশোধের দায় জাতির। আমি বলব, বৈদেশিক ঋণের দায় যেমন বেড়েছে তেমনি তা পরিশোধের দায়বদ্ধতাও ক্রমে বাড়ছে। ঋণের মাত্রা যেন আরও ক্ষতিকর দিকে না যায় তা বর্তমান সরকারকে দেখতে হবে। এটিই বর্তমান সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে বৈদেশিক ঋণ সীমিত রাখার ব্যবস্থা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। মোদ্দাকথা, বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা কমাতে হবে।’

গত ১৬-১৭ বছরে দেশে বিদেশি ঋণ চার গুণ বেড়েছে। কয়েক বছর ধরেই বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সামনের দিনগুলোতে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করার তাগিদ রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণপ্রকল্পের ঋণের কিস্তি শুরু হতে যাচ্ছে শিগগির। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তিও শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় বড় মেগা প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান দায় সম্পর্কে গত সপ্তাহে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে ঋণের দায়গ্রস্ততার দিকে এগোচ্ছে। তাই নতুন করে ঋণ নেওয়ার আগে দেশের ঋণধারণক্ষমতা বা ঋণের চাপ সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে কি না তার মূল্যায়ন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার আগে এসব ঋণ পরিশোধে কত সময় লাগতে পারে সেটিও হিসাব করে দেখা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘বৈদেশিক ঋণ ও দায়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরকার এখনো সমন্বিতভাবে কোনো মূল্যায়ন করেনি। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে ঋণের চাপ ও পরিশোধ-সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন দরকার। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে শুধু নতুন অর্থ পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটি দেখলে হবে না। ঋণ কতটা প্রয়োজনীয়, কী কাজে ব্যবহৃত হবে, কত সময়ে তার সুফল পাওয়া যাবে এবং ভবিষ্যতে ঋণ ও সুদ পরিশোধে দেশের সক্ষমতা থাকবে কি না, সেসব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।’

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের বিধ্বংসী প্রভাব অর্থনীতিতেও পড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিনিয়োগকারীরা সরে গেছে এসবের ফলে রাজস্ব আহরণে ভাটা পড়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারকে সরকার পরিচালনায় বৈদেশিক ঋণনির্ভর হতে হয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদে এর জের থেকেই যাবে।

বৈদেশিক ঋণবৃদ্ধিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দায় সম্পর্কে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত