সিন্ডিকেটে জামিন ছিনতাইকারীদের!

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় ছিনতাইকারী হিসেবে নাম রয়েছে সেলিম মিয়ার (৩১)। তিনি নিউ মার্কেট ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম করে আসছেন। তার নামে ঢাকার বিভিন্ন থানায় আছে ১৩ মামলা। গ্রেপ্তার হন আর জামিনে বের হয়ে আসাই তার আরেক পেশা। ‘বিশাল সিন্ডিকেটের’ মাধ্যমে মূলত জামিন পাচ্ছেন। এই জন্য গুনতে হচ্ছে বিশাল অঙ্কের অর্থ। ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর প্রথমবার তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কারাগারে যাওয়ার পর জামিনে বেরিয়ে ফের শুরু করেন ছিনতাই। পরে আরও ১২ বার গ্রেপ্তার হন, তবে প্রতিবারই জামিনে বেরিয়ে জড়িয়ে পড়েন একই অপরাধে। সম্প্রতি গ্রেপ্তারের পর ডিএমপির স্পেশাল  মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্টেট কোর্টে সাজা হয়েছে তার।

শুধু সেলিমই নন, তার মতো এমন হিরু মিয়া, জামাল হোসেন বাপ্পী ওরফে কার্টুন, রবিউল হোসেনসহ অনেক ছিনতাইকারীই গ্রেপ্তারের দুই থেকে তিন মাস পর জামিনে বেরিয়ে আসে। এমনকি গ্রেপ্তারের তিনদিনের মধ্যেও বেরিয়ে আসার রেকর্ডও রয়েছে এসব অপরাধীর। কারাগারে সংশোধন হওয়ার কথা থাকলেও তারা বাইরে এসে আবারও ফিরছেন অপরাধ জগতে। ঢাকা শহরে এমন অপরাধে জড়িত চুরি ও ছিনতাইকারী চক্রে সক্রিয় রয়েছে অন্তত সাত হাজার অপরাধী। এসব অপরাধে জড়িত থাকার পরও অল্পদিনে জামিন পাওয়ায় নতুন কৌশলে হাঁটছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সারওয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা শহরের চুরি ও ছিনতাইসহ অপরাধ দমনে সিনিয়র-জুনিয়র অফিসার থেকে ফোর্স সবাই মাঠে সক্রিয় রয়েছে। মহানগরবাসীর নিরাপত্তায় রাতে রাজধানীতে তিন শতাধিক গাড়ি, শতাধিক মোটরসাইকেল পেট্রোল টিম, ৮০-৯০টি চেকপোস্ট এবং ডিবি-সিটিটিসি-ট্রাফিক সদস্যরাও মাঠে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় ‘ব্লক-রেড’ অপারেশন চালানো হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধীদের একটি শ্রেণিকে ডিএমপির বিশেষ কোর্টের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এতে ছোটখাটো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন রাতে রাজারবাগ থেকে ৫০-৬০ প্লাটুন ফোর্স শহরের নিরাপত্তায় কাজ করছেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট এলাকায় এক হাজার ফোর্স মোতায়েন করা রয়েছে।

ভাসমান ও উঠতি বয়সীরা ছিনতাই কাজে : ছিনতাইকারীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভাসমান ও উঠতি বয়সী তরুণরা বেশি জড়িয়ে পড়ছে এসব অপরাধে। রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ছিনতাই গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছে। এরমধ্যে বংশাল, তাঁতীবাজার ও ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করে কোহিনুর বেগম মালা এবং কয়েকজন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি। গ্রুপের সদস্যরা ছিনতাই করা মালামাল তাদের কাছে জমা করেন। সিন্ডিকেটের ছত্রছায়া ছাড়া কেউ এ কাজে সুবিধা করতে পারে না। প্রাথমিক পর্যায়ে কেউ এককভাবে ছিনতাই শুরু করলেও একপর্যায়ে তাকে গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। গ্রুপে থাকা জামিনের ক্ষেত্রে বড় সহায়ক।

‘পুলিশের  সংক্ষিপ্ত  আদালত’: ডিএমপির স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গত তিন মাসে সাজার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিসেম্বর (২০২৫) থেকে ফেব্রুয়ারি (২০২৬) পর্যন্ত ৮ হাজার ৫৪৯টি মামলা সংক্ষিপ্ত বিচার আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ১৪ হাজার ৯৪৫ অপরাধীকে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৩০৩ জন অপরাধীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয় ‘সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত’। বাকি ৬ হাজার ৬৪২ জনকে ৩১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা অর্থদ- করা হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে ডিএমপির আট বিভাগ কর্র্তৃক ৫ হাজার ৬২৯ জনকে গ্রেপ্তার করে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সংক্ষিপ্ত বিচার আদালতে তাদের বিরুদ্ধে ২ হাজার ৯৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি করে। এসব মামলায় ২ হাজার ৭৭৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করে আদালত। চলতি বছরের ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিট ৫ হাজার ৬১০ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত তাদের বিরুদ্ধে হওয়া ৩ হাজার ২৯২টি মামলা নিষ্পত্তি করে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৩ হাজার ৪১৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে। এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশ ৩ হাজার ৭০৬ জনকে গ্রেপ্তার করে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলে। পরে সংক্ষিপ্ত বিচার আদালতে তাদের বিরুদ্ধে করা ২ হাজার ২৭৩টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ১১৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেয় আদালত।

মামলার জট কমানোর চেষ্টা : ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, ছোটখাটো অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর তাদের ডিএমপির ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এতে মামলার জট কমছে এবং হাজিরসহ পুলিশের ঝামেলাও কমেছে অনেকাংশে। এছাড়া এলাকাভিত্তিক অপরাধ দমাতে নতুন কৌশল ‘ব্লক রেড অপারেশন’। অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে অপারেশনের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে সুবিধামতো সময়ে পুরো এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘিরে ফেলছে। এরপর শুরু হচ্ছে চিরুনি অভিযান। তবে আজ থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। 

জামিনের বিষয়ে জানে না পুলিশ : পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, মাদক, চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়। তারা গ্রেপ্তারের ৩দিন পর থেকে যে কোনো দিনই জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। এতে অপরাধ দমাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে হলে অনেক কাঠখড় পুড়াতে হয়। কিন্তু তাদের জামিন কোনোভাবেই ঠেকানো যায় না। আর এসব অপরাধীকে জামিন করানোর জন্য এক ধরনের আইনজীবী সব সময় প্রস্তুত থাকে। এমনকি জামিনের পর এই তথ্য পুলিশকে জানানো হয় না। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ঢাকা শহর জুড়ে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যের লাগাম টানতে নির্বাচনের আগ থেকেই নতুন কৌশল নেয় ডিএমপি। এসব অপরাধে কাউকে গ্রেপ্তারের পর তার পিসিপিআর বিশ্লেষণ করে ম্যাজিস্ট্রেসি কোর্টে তোলা হচ্ছে। এতে ডিএমপির মোবাইল কোর্ট তাদের অপরাধ অনুযায়ী সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠাচ্ছে। এতে অপরাধীদের সম্পর্কে পুলিশের ডাটাবেজে তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। থানায়ও অপরাধীদের জামিনের তথ্য রাখছে। এতে অপরাধীদের ওপর নজরদারি করতে আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে।

ডিএমপির একাধিক থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিএমপির স্পেশাল কোর্টে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি মামলার আসামিদের সাজা হওয়ায় ঈদের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার সুযোগ তেমন একটা নেই। কারণ প্রতিটি থানা এলাকার চিহ্নিত এসব অপরাধীকে ইতিমধ্যে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।

জামিনের সময় আদালতকে যা বলেন আইনজীবীরা : ছিনতাই মামলার আসামি জামিন করানোর সময় আইনজীবীরা আদালতকে বলেন, ‘‘পালাবে না স্যার, ভালো ‘সিওরিটি’ দেব স্যার।” পরে আদালতে টাকাকড়ির জামানত রেখে তারিখে তারিখে হাজিরার শর্তে বিচারের আগে আসামি মুক্তির সুবিধা ভোগ করতে পারেন। নগদ জমার বিধান আছে অনেক দেশে। আমাদেরও আছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১৩ ধারায়। শর্ত খেলাপ করে আসামি ভেগে গেলে বাজেয়াপ্ত হবে বন্ডে লেখা টাকা। আসামি বা জামিনদার যে-কারোর থেকেই কিংবা দুজনের থেকেই সে-টাকা আদায়যোগ্য (চুক্তি আইনের ১২৮ ধারা)। স্বেচ্ছায় না দিলে অস্থাবর-সম্পদ ক্রোক করে নিলামে বেঁচে আদায় করবে আদালত। তাতেও না হলে ৬ মাসের সিভিল জেল। তবে কার্যবিধির ৫১৪ ধারার এসব বিধান কার্যকর হয় না।

পুলিশের তালিকায় ৭ হাজার ছিনতাইকারী : সংশ্লিষ্টরা জানায়, ঢাকায় দাপিয়ে বেড়ায় সাত হাজার ছিনতাইকারী। তাদের বড় অংশের নামে ১০টির বেশি ছিনতাই ও মাদক মামলা রয়েছে। আর ৫-৯টি মামলা রয়েছে অর্ধেকের বেশি ছিনতাইকারীর নামে। এসব মামলায় অনেকের সাজা হয়ে গেছে। তারপরও তাদের কারাগারে আটকে রাখা যাচ্ছে না। আদালতে পুলিশের জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে আসামির সব অপরাধের বিস্তারিত তথ্য (পিসিপিআর) থাকলেও আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন তারা।

পুলিশ বলছে, ছিনতাই মামলার আসামিদের জামিন করানো বিষয়ে আইনজীবীদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। তারা এসব আসামির বিষয়ে খোঁজখবর রাখবেন বলে আদালতকে জানালেও জামিনের পর আর কোনো খোঁজ রাখেন না। এছাড়া ফৌজদারি মামলা পরিচালনার জন্য নিম্ন আদালতে সরকারের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন পিপি ও সহকারী পিপিরা (এপিপি)। এসব অপরাধীর জামিন হওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরও ভূমিকা থাকে। তারা জামিনের বিরোধিতা করলে এত সহজে জামিন পেতেন না। এক্ষেত্রে তাদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। আইন কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০০৭ সালের আগে আদালতে কোর্ট উপপরিদর্শক (সিএসআই) নিম্ন আদালতে মামলা পরিচালনা করতেন। তারা মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে আদালতে তথ্য দিতেন। তখন মামলার নিষ্পত্তির সংখ্যা বেশি ছিল। অপরাধীরা এত সহজে জামিনও পেতেন না। মামলার সাজার হারও ছিল বেশি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত