মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধে ইতোমধ্যে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ’ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান এসব হামলায় সামরিক ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। যদিও গত কয়েকদিন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্রা কিছুটা কমেছে, তবুও তেহরান এখনো পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। পাশাপাশি নিজেদের গোপন অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত এখনো অক্ষত রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র।
এদিকে মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে দেওয়া জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে সঙ্গে চলমান যুদ্ধে গত চার সপ্তাহে ইরান বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এছাড়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইরান দাবি করে তাদের গোপন অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত অক্ষত রয়েছে। বৃহস্পতিবার(২এপ্রিল) ইরানের সামরিক বাহিনীর ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইব্রাহিম জোলফাঘারি ওই দাবি করে বলেন, আপনারা যেসব স্থানে হামলা করেছেন বলে মনে করছেন, সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের কৌশলগত সামরিক উৎপাদন এমন সব স্থানে হয়, যেগুলোর বিষয়ে আপনাদের কোনো ধারণা নেই এবং কখনোই পৌঁছাতে পারবেন না।
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল নয়, তবে মিত্রদের সহায়তার জন্য অঞ্চলটিতে অবস্থান করছে।তিনি সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনসহ আঞ্চলিক মিত্রদের ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, ‘আমরা তাদের কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেব না। ভাষণে ট্রাম্প পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তিনি দাবি করেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ ও ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ স্লোগান দিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন হামলার পেছনে তাদের ভূমিকা রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, তার প্রশাসন আগেই সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেছে এবং ২০২০ সালে ইরানের কুদস ফোর্সের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল। ট্রাম্প দাবি করেন, চলমান সামরিক অভিযানের ‘মূল লক্ষ্য প্রায় অর্জিত’ এবং যুদ্ধ শেষের পথে। তবে প্রয়োজন হলে আরও কঠোর হামলা চালানোর হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
অন্যদিকে, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তারা আরও বড় ও ধ্বংসাত্মক পাল্টা আঘাত হানবে।বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে ইরানের সামরিক অপারেশনাল কমান্ড ‘খাতাম আল-আনবিয়া’ জানায়, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এই যুদ্ধ চলবে-আপনাদের অপমান, পরাজয়, স্থায়ী অনুতাপ ও আত্মসমর্পণ না হওয়া পর্যন্ত।’বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আরও কঠোর, বিস্তৃত এবং ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সমরে তেহরানের হাতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ একটি কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইসরায়লের একটি নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা-আলমা রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টার-এর হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর সময় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সংখ্যা ছিল ২,৫০০, যা এখন কমে প্রায় ১,০০০-এ নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের মিসাইল শিল্প ও মজুদ প্রায় ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ নাগাদ ইরানের মোট ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা একদিকে মজুদ কমার হিসাব তুলে ধরছেন, অন্যদিকে সতর্ক করছেন যে ২০২৭ সালের মধ্যে ইরান ৮,০০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরি করতে পারে। একই সময়ে রাশিয়া ও চীন মিসাইল আমদানি করতে পারে ইরান, যা তেহরানের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেন না, তবে তারা দাবি করেন, তাদের অস্ত্রভাণ্ডার অক্ষত এবং নিরাপদে ভূগর্ভে সংরক্ষিত রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও নিজেদের গোলাবারুদ বা মিউনিশনের অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে সংযত অবস্থান বজায় রেখেছেন।