ট্রাম্পের শুল্কে ক্ষুব্ধ কানাডা, আজই আসছে পাল্টা ঘোষণা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কের জবাব মঙ্গলবার ঘোষণা করবে কানাডা। কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ মিত্র কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠায় দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কানাডা সরকার সোমবার রাতে জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অটোয়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে কানাডার পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন। সরকার বলেছে, ‘এই কঠিন সময়ে’ কানাডার শ্রমিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত শুক্রবার নতুন করে কানাডার কিছু পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ঠেকাতে দুই দেশ কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পরও চুক্তি না হওয়ায় শনিবার থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়। এর জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয় অটোয়া।

এরই মধ্যে সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী বছর কানাডা থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করা হবে। বর্তমানে কানাডার গাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, যা মূলত গাড়িতে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের উপকরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা স্টিলের ওপর সাধারণভাবে ৫০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এর আগে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে ‘খারাপ চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও শিল্পের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আওতায় মার্কিন স্টিল ও দুগ্ধশিল্পের পাশাপাশি কৃষি সরঞ্জাম, কাগজ ও ইলেকট্রনিকস খাতও থাকবে।

কার্নি সোমবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার লক্ষ্য ছিল ‘কানাডীয়দের জন্য সর্বোত্তম চুক্তি করা, যেকোনো মূল্যে বা যেকোনো সময়সীমায় চুক্তি করা নয়।’

তিনি অভিযোগ করেন, আলোচনার সময় মার্কিন পক্ষ অন্যায্য শর্তের মাধ্যমে কানাডার গাড়ি, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। এ কারণেই কানাডা চুক্তিতে রাজি হয়নি বলে জানান তিনি।

কার্নি আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহুমুখী করা শুরু থেকেই কানাডার পরিকল্পনার অংশ।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, আলোচনার শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য চুক্তিতেও বিধিনিষেধ আরোপের দাবি তোলা হয়েছিল। পাশাপাশি ফরাসি ভাষা ও কুইবেকের সংস্কৃতি নিয়েও মার্কিন পক্ষ ‘অগ্রহণযোগ্য হুমকি’ দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সোমবার এক অনুষ্ঠানে আলোচনার শেষ মুহূর্তে কানাডার ‘অযৌক্তিক দাবি’র সমালোচনা করেন।

কানাডার অর্থনীতিতে উদ্বেগ

কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। চলতি বছর পণ্য বাণিজ্যের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডা, প্রথম অবস্থানে রয়েছে মেক্সিকো।

তবে নতুন শুল্ক নিয়ে কানাডার সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রবিবার প্রকাশিত অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, চারজনের মধ্যে প্রায় তিনজন কানাডীয় বাণিজ্য আলোচনা থেকে সরে আসায় কার্নি সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। তবে জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি পাঁচজনের দুজন নিজেদের চাকরি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রাদেশিক সরকারের প্রধান (প্রিমিয়ার) ডগ ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের হুমকির তীব্র সমালোচনা করেছেন। এমনকি ট্রাম্পকে কড়া ভাষায় পাল্টা জবাবও দিয়েছেন তিনি।

ফোর্ড সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এর আগে বাণিজ্য বিরোধের এক পর্যায়ে অন্টারিও তিনটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করেছিল।

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফোর্ডের সমালোচনা করেন এবং আরও কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন।

নতুন শুল্ক যেসব পণ্যে

হোয়াইট হাউসের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালকোহল, গাড়ি ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে কানাডা বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প শুল্ক কার্যকরের সময়সীমা তিন দিন পিছিয়ে দিলেও শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

নতুন শুল্ক কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশের ওপর কার্যকর হবে। এসব পণ্যের মোট মূল্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে হকি স্টিক, সিমেন্টসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে।

ট্রাম্প সোমবার অভিযোগ করেন, কানাডা ‘বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়েছে’। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কানাডাকে প্রয়োজন নেই, তাদেরই আমাদের প্রয়োজন।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শনিবার গণমাধ্যমকে জানান, ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনায় কিছু ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে সফটউড কাঠের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়া এবং গাড়ির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক কমানোর প্রস্তাব ছিল। বেশির ভাগ কানাডীয় স্টিলের ক্ষেত্রে শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও টানাপোড়েন

শুল্ক বিরোধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যকার উত্তর আমেরিকান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইউএসএমসিএ) নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাম্প বর্তমান কাঠামোতে চুক্তিটি নবায়ন করতে অনাগ্রহী।

এর পাশাপাশি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার হুমকি দিয়ে এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও তার পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডোকে ‘গভর্নর’ বলে সম্বোধন করে ট্রাম্প বারবার কানাডীয়দের ক্ষুব্ধ করেছেন। দুই দেশের চলমান বাণিজ্য বিরোধের মধ্যে এসব মন্তব্যও সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও বাড়িয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত