এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইরান যুদ্ধ নিয়ে ঘরে-বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মূল কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে হামলা আরও জোরদার করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। ভাষণে ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছেন এই রিপাবলিকান। গত বুধবার দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানকে ‘বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী মদদদাতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে বেশি জয়ী হচ্ছে। গত চার সপ্তাহে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত ও নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করেছে। তবে ট্রাম্পের ভাষণের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সেনাবাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ‘তুচ্ছ’ সব লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানে খুবই কঠিন আঘাত হানার মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়ায় এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। সেনাবাহিনীর ওই মুখপাত্র সতর্ক করে বলেন, সামনে আরও ‘বিস্তৃত, শক্তিশালী ও বিধ্বংসী’ হামলা আসছে। ইরানের সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারণা অসম্পূর্ণ বলে জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনীর খতম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ড সদর দপ্তর। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, শত্রুরা আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ইরানের নেতৃত্বের সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, এই ‘ধর্মান্ধ শাসকগোষ্ঠী’ গত ৪৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধ্বংস কামনা করছে। তার দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, ইরানি নৌবাহিনী বিলীন হয়ে গেছে এবং তাদের বিমানবাহিনী এখন পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। ট্রাম্প জানান, ইরানের পক্ষ থেকে আসা হুমকি চিরতরে বন্ধ করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্যগুলো খুব দ্রুতই সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। তবে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ চলবে বলে জানান ট্রাম্প। পরবর্তী দুই থেকে তিন সপ্তাহে আরও তীব্র হামলার সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি, আমরা তাদের প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেব, যেখানে তাদের থাকা উচিত’। ট্রাম্প উল্লেখ করেন যে, ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ কখনোই তার লক্ষ্য ছিল না, তবে ইরানের খামেনির মৃত্যুর পর এটি ঘটে গেছে। তবে দ্রুতই কোনো চুক্তি না হলে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে একযোগে ভয়াবহ হামলার হুমকিও দেন তিনি।
ভাষণে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। যদিও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে সামরিক পদক্ষেপ বিষয়ে ট্রাম্পের আহ্বান আগেই নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা; যা নিয়ে ক্ষোভ ঝরেছে ট্রাম্পের কণ্ঠে। উপসাগরীয় তেল আমদানিকারক দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রণালিতে যান এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিন, এটিকে রক্ষা করুন। কিছুটা সাহস সঞ্চয় করুন। ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তারা দুর্দান্ত কাজ করেছে এবং আমরা কোনোভাবেই তাদের ব্যর্থ হতে দেব না। এদিকে, অবরুদ্ধ হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার উপায় খুঁজতে বৈঠক ডেকেছে যুক্তরাজ্য। গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় এই ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নেয় ৩৫টি দেশ। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের সভাপতিত্বে এই বৈঠকে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার, আটকে পড়া জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চলমান অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে অন্তত ২ হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ। এর মধ্যে তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার ৩২০টির বেশি। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের বরাতে আরব নিউজ জানায়, পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া জাহাজগুলোর মধ্যে ১২টি বড় গ্যাসবাহী জাহাজ ও ৫০টি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন হরমুজ দিয়ে অন্তত ১২০টি জাহাজ চলাচল করলেও গত দুই দিনে মাত্র ছয়টি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে বলে জানিয়েছে কেপলার। জাহাজ চলাচল নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষণকারী সংস্থা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত ৪৮টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। আর এসব জাহাজের বেশিরভাগই ইরান ও তার মিত্র দেশের।
আরও বিধ্বংসী জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তুচ্ছ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র। সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেছেন, সামনে আসছে বিপর্যয়কর, আরও বিস্তৃত ও বিধ্বংসী আঘাত। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এই দুই দেশ তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ও সরঞ্জাম সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্য রাখে। তিনি বলেন, ইরানের সামরিক উৎপাদন এমন জায়গায় হয়; যার ব্যাপারে পশ্চিমাদের কোনো ধারণাই নেই। ইরানের অস্ত্রভাণ্ডার ব্যাপকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানি ওই সেনা কর্মকর্তা। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানি সেনাবাহিনীর খতম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল কমান্ড সদর দপ্তর বলেছে, শত্রুদের আত্মসমর্পণ পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। বৃহস্পতিবার সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের সামরিক শক্তি ও সরঞ্জাম সম্পর্কে শত্রুদের ধারণা একেবারেই অপূর্ণ। আমাদের বিশাল এবং কৌশলগত সক্ষমতা সম্পর্কে আপনাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই।