রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই। হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষ যে ওয়ার্ড খোলা হয়েছে, এরই মধ্যে সেটি পূর্ণ হয়ে গেছে। হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এখন তিনগুণেরও বেশি। সাধারণের ধারণা ছিল, শুধু শিশুরাই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু রাজশাহীতে হামের উপসর্গ নিয়ে বেশ কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। রামেকের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৫০ বছর বয়সী রোগীও দেখা গেছে।
রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোতে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে হামের সংক্রমণ। দিন যত গড়াচ্ছে এর বিস্তার ঘটছে। রামেকে প্রতিদিনই হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাম আক্রান্ত রোগী থেকে যেন নতুন করে কেউ হামে আক্রান্ত না হয় সেজন্য গত সপ্তাহে হাসপাতালে চালু হয়েছে আইসোলেশন ওয়ার্ড। ৪০ শয্যার এই ওয়ার্ডটি চালুর দিনই পূর্ণ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে শিশু ওয়ার্ডগুলোতেও হামের রোগীদের কর্নার চালু করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর যে চাপ, তাতে ওয়ার্ডগুলোতে কর্নারের পরিধিও বাড়ছে। এদিকে শিশু ওয়ার্ডের পাশাপাশি বড়দের ওয়ার্ডেও একই ধরনের কর্নার চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রামেকের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় রামেকে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন এক শিশু মারা গেছে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ জন। অন্যদিকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন চার রোগী। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১২ রোগী।’ এ ছাড়া গত মাস থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ৩৪০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন বলেও তিনি জানান।
ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, ‘রামেকে ভর্তি রোগীদের বড় অংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জের। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা, দক্ষিণাঞ্চল এবং ঢাকা বিভাগের অনেক জেলা থেকেও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীরা আসছেন।’ আপাতত ওয়ার্ডের কর্নারে রেখে চিকিৎসা চললেও রোগীর চাপ বাড়লে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের পুরো একটি শিশু ওয়ার্ডকে হাম আইসোলেশন ইউনিটে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেন।
এদিকে, স্বাস্থ্য সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী রামেক হাসপাতালের আইসিইউয়ের বাড়তি চাপ সামলাতে রাজশাহীর হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের আইসিইউতে রোগী স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া রামেকের আইসিইউতে ১২ বেডের জায়গায় যুক্ত হয়েছে আরও ছয়টি বেড।
প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত : হাম আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসাধীন কাইমুদ্দীনের বয়স ৫০। গত বুধবার তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে আইসোলেশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। একইভাবে শাহাদী ইসলাম নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকেও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আইসোলেশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। এ দুজনের রোগ হাম ও নিউমোনিয়া লেখা হলেও একই দিন বদরুল ইসলাম নামে ৩৫ বছর বয়সী এক রোগীকে ১৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আইসোলেশন সেন্টারে পাঠানোর সময় হামের সন্দেহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রামেকে ভর্তি কাইমুদ্দীন পেশায় রিকশাচালক। বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার হেলালপুর গ্রামে। হাসপাতালে তার সঙ্গে থাকা স্ত্রী শামিমা বেগম জানান, গত সাত দিন ধরেই তার স্বামীর জ¦র। গত মঙ্গলবার তারা খেয়াল করেন, কাইমুদ্দীনের গলায় ঘামাচির মতো কিছু একটা হচ্ছে। এটি দেখেই চিকিৎসক তাকে রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করেন।’ শামিমা বলেন, ‘প্রচ- জ¦র, মাথাব্যথা, কাশি। জ¦রে মাথায় কাজ করছে না। সাপজিটরেও কাজ হচ্ছে না।’
৩৫ বছরের বদরুল ইসলামের বাড়ি জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার নলপুকুর গ্রামে। কৃষক বদরুলেরও এক সপ্তাহ ধরে জ্বর ছাড়ছিল না বলে জানালেন সঙ্গে থাকা তার স্ত্রী খালেদা খাতুন। তিনি জানান, গোদাগাড়ী উপজেলা সদরে গিয়ে ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন তার স্বামী। কিন্তু তাতেও জ¦র ছাড়েনি। এর মধ্যে মুখে ঘা হয়। আর দেরি না করে হাসপাতালে আসেন। এখন চিকিৎসকরা সন্দেহ করছেন, তার স্বামী হামে আক্রান্ত। তাই আইসোলেশন ওয়ার্ডে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কিশোর শাহাদী ইসলামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পিয়ারাপুর এলাকায়। হাসপাতালে তার মা মেরিনা বেগম জানান, ৯ দিন ধরে জ্বর আছে শাহাদীর। সঙ্গে বমি, পাতলা পায়খানা ও কাশি। চার দিন আগে শাহাদীর শরীরে হাম বের হয়েছে। তাই হাসপাতালে এনেছেন।
রামেকের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, শিশুদের পাশাপাশি বড়দের মধ্যেও হামের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। আমরা কয়েকদিন থেকেই উপসর্গ থাকা রোগী পাচ্ছি। এ পর্যন্ত চারজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী ভর্তি হয়েছেন, যাদের হাম আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ রয়েছে।
