উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত ও শিশু আইন, ২০১৩-এর বিধান অনুযায়ী, আইনের আওতায় আসা শিশুদের বিচার হবে শুধুই শিশু আদালতে; শিশুবান্ধব পরিবেশে। তবে, এ আইনকেও অসঙ্গতিপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও স্ববিরোধী বলে মনে করেন ফৌজদারি আইন বিশ্লেষকরা। কিন্তু আইনটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বাস্তবায়নেও গতি নেই। ১৩ বছরে বিশেষায়িত শিশু আদালত হয়েছে মাত্র ১২টি!
শিশু আইনের ১৬ (ক) ধারা অনুযায়ী, শিশুদের যেকোনো অপরাধের বিচারের জন্য প্রতিটি জেলায় এক বা একাধিক শিশু আদালত থাকবে। আবার এই ধারার (খ) তে বলা হয়েছে, পৃথক শিশু আদালত না হওয়া পর্যন্ত দেশের প্রতিটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালই শিশু আদালত হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ যেসব আদালতে ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন, হত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার হয়, আসামিদের হাজির করা হয়, সেগুলোতেই নির্দিষ্ট দু-এক ঘণ্টা শিশু আদালত হিসেবে চলে। এই আদালত ব্যবস্থাকে শিশু আদালত বলতে নারাজ আইনজ্ঞরা।
শিশু আইনের ১৬ ধারাকেই স্ববিরোধী বলে মনে করেন ফৌজদারি আইনবিদ অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী। দেশ রূপান্তরকে বলেন, একদিকে শিশু আদালতের কথা বলা হলেও উপধারা খ এ ‘নারী-শিশু ট্রাইব্যুনাল’কে ‘শিশু আদালত’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া স্ববিরোধী। যদি ট্রাইব্যুনালেই বিচারকাজ হবে তাহলে তো পৃথক শিশু আদালতের উল্লেখের কোনো দরকার ছিল না।
আইনের ১৭ (৪) ধারায় বলা হয়েছে, সাধারণত যেসব দালান বা কামরায় প্রচলিত আদালতের বিচারকাজ চলে, সেগুলো ছাড়া অন্য কোনো দালান বা কামরায় প্রচলিত আদালতের লালসালুঘেরা এজলাস ও আদালত কক্ষের পরিবর্তে সাধারণ কক্ষে পৃথক দিবস ও সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক ছাড়া শুধু শিশু আদালতের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯ ধারায় শিশু আদালতের আসনবিন্যাস সম্পর্কে বলা হয়েছে, এমনভাবে শিশু আদালত করতে হবে যেন শিশুর মাতা-পিতা, অভিভাবক, আইনজীবী তার কাছাকাছি থাকতে পারেন। এছাড়া আদালত চলাকালীন আইনজীবী, পুলিশ ও আদালতের কর্মচারীরা তাদের পেশাগত বা দাপ্তরিক পোশাক পরতে পারবেন না। ৩৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো শিশু আটক হলে তার কোমরে দড়ি, ডান্ডাবেড়ি বা হাতকড়া পরানো যাবে না।
শিশু আইনের বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা খুঁজতে সম্প্রতি ঢাকার আদালত এলাকার তিনটি ভবন ও একটি টিনশেড বিল্ডিংয়ে অবস্থিত ৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ‘শিশু আদালত’ কার্যক্রম সরেজমিনে ঘুরে দেখেন দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক। কথা বলেন আদালতসংশ্লিষ্ট কর্মচারী এবং আইনজীবীদের সঙ্গে। দেখা যায়, আদালতের শিশুসুলভ পরিবেশ বলতে আইনে যা বলা আছে তার প্রায় কোনো কিছুর প্রতিফলন নেই। কার্যদিবসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আইনের আওতায় আসা শিশুদের হাজিরা ও বিচারকাজ চলে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পরিবেশ যেমন আছে তেমনই থাকে শিশু আদালত হিসেবে পরিচালিত হওয়ার সময়ও। হাজিরা দিতে আসা ব্যক্তিদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। জনাকীর্ণ আদালতে অন্যান্য আসামিদের যেভাবে হাঁক দিয়ে নাম ধরে ডাকা হয় শিশুদেরও সেভাবেই হাঁক দিয়ে ডেকে হাজিরা নিশ্চিত করা হয়।
৩ মার্চ বেলা সোয়া ১১টা। ঢাকার জেলা ও দায়রা আদালত ভবনের পাঁচ তলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এর সামনের বারান্দা। আদালত কক্ষের ভেতরে-বাইরে জটলা। অনেক মানুষের ভিড়ে জিন্স প্যান্ট ও টিশার্ট পরা অল্পবয়স্ক এক তরুণ ইতিউতি করছেন। উসখুখুশকো চুল। ক্লান্ত-শ্রান্ত মলিন চেহারা। আদালতের জনাকীর্ণ পরিবেশে কুঁকড়ে যাচ্ছেন বারবার। কথা বলে জানা গেল, ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরের শেওরাপাড়ায় এক শিশুকে ধর্ষণের মামলার তিনি আসামি। সাক্ষ্য গ্রহণের ধার্য দিনে হাজিরা দিতে এসেছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম তারিখ ২৪ মার্চ ২০০৭। ঘটনার সময় তার বয়স ছিল ১৫ বছর। ঘটনার পর কিছুদিন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ছিলেন। জামিনে থেকে গত চার বছর ধরেই শিশু আইনের মামলায় হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন। মামলার অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৯ জনকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজনও সাক্ষী আসেনি। এমনকি বাদীপক্ষের কেউও আর আদালতমুখো হননি।
ওই তরুণ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই খানে (আদালত) আসতে ভালা লাগে না। খালি মানুষ আর মানুষ। ক্যামনে যানি চাইয়্যা থাকে। বসার জায়গা নাই। সকাল থাইক্যা দাঁড়ায়া আছি। উকিলরে কইছি মামলা যেমনেই হোক শেষ করেন।’ তার আইনজীবী রাফিকা খাতুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে পরিবেশ দেখছেন তাতে এখানে আসতে যে কেউ নিরুৎসাহিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। দিনের পর দিন সাক্ষী আসে না। শুধু তারিখ পড়ে। আদালতকে বলেছি একটা সমাধান দেন।’
দুটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দুজন বেঞ্চ সহকারী নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে অভিন্ন সুরে বলেন, মাঝেমধ্যে বিচারক কিংবা তারা আইনজীবী, পুলিশদের দাপ্তরিক পোশাক পরিবর্তনের কথাটি স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু কেউ আমলে নেয় না, বরং কটূক্তি শুনতে হয়। আর আদালতের পরিবেশ এমনই থাকে যে, বিচারকেরাও সাধারণত এ নিয়ে কাউকে তাগিদ ও চাপ দেন না। ফলে শিশু আদালত শুধু আইনের বইতেই আছে বাস্তবে তার কার্যকারিতা নেই। এ প্রসঙ্গে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শত শত মানুষের ভিড়ে কোনটি শিশু আদালত, আর কোনটি বড়দের তা আলাদা করা যায় না। শিশুদের জন্য আইনের বিধান মেনে শিশু আদালত প্রতিষ্ঠাই যথোপযুক্ত হবে। না হলে আদালতের বিরূপ পরিবেশে শিশুদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
যে পরিবেশে শিশুদের বিচার হয়েছে তা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘শিশু-কিশোররা সংবেদনশীল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এতদিনেও শিশু-কিশোরদের উপযোগী আদালত তৈরি করা যায়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এক ধরনের নেতিবাচক পরিবেশে গ্যাং কালচার, কিশোর গ্যাং’র মতো পরিস্থিতি ও প্রতিফলন আমরা দেখছি।’ তিনি বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের জন্য পৃথক আদালত করতে না পারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যর্থতা। এখনই এ বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। নইলে আরও নেতিবাচক পরিস্থিতি দেখতে হবে।’
১৩ বছরে বিশেষায়িত শিশু আদালত মাত্র ১২টি!
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গত ডিসেম্বরের হিসাব অনুসারে সারা দেশে শিশু আইনে ৪৪ হাজার ৫১৩ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দেশের প্রায় ১০০ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে শিশু আদালত হিসেবে গণ্য করে এসব মামলার বিচার চলছে। অথচ শিশু আইনে প্রতি জেলায় বিশেষায়িত ‘শিশু আদালত’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শিশু আইন হওয়ার পর গত ১৩ বছরে সারা দেশে বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠা হয়েছে মাত্র ১২টি।
কয়েক বছর আগে আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং ইউনিসেফের ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি অব জুডিশিয়াল সিস্টেম ফর চাইল্ড প্রোটেকশন ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় ২০ জেলায় পৃথক শিশু আদালত স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আওতায় রাজশাহীতে দুইটি এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল, হবিগঞ্জে, বরগুনা, রংপুর, জামালপুর, খুলনা, কক্সবাজারে একটি করে শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ছাড়া ঝালকাঠি ও যশোরে জেলার জজশিপের উদ্যোগে দুইটি শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই আদালতগুলো সাজানো হয়েছে শিশুবান্ধব হিসেবে। যেখানে শিশুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা, বিশ্রাম কক্ষ, উন্নত শৌচাগার রয়েছে। কিন্তু শিশু আইনে সবচেয়ে বেশি ৪ হাজার ২২৪ মামলা বিচারাধীন আছে ঢাকার ৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। এখানে কোনো পৃথক শিশু আদালত নেই।
আদালত-শ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত ভবন প্রাঙ্গণে শিশুবান্ধব একটি পৃথক শিশু আদালত উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু বিচারকাজ শুরু হয়নি। গত বছর মার্চে অন্তর্বর্তী সরকার সব জেলাতে পৃথক শিশু আদালত স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবে প্রতিফলন ঘটেনি।
পৃথক শিশু আদালতের বিষয়ে জানতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
আইন ও বিচার সচিব লিয়াকত আলী মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পৃথক শিশু আদালত প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী বলেন, বলেন, ‘নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে প্রতিদিন বিচারকদের অনেক মামলা শুনতে হয়। সঙ্গত কারণেই সেখানে শিশু আদালত চালানোর যে প্রসিডিউর সেটা বাস্তবে সম্ভব হবে না। তাই আইনের বিধান মেনে প্রতিটি জেলায় পৃথক শিশু আদালত দরকার। যদি তা না করা হয় তাহলে ট্রাইব্যুনালে যে শিশুদের আনা হবে তারা সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের সংস্পর্শে এসে অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’