যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। গত শুক্রবার ভূপাতিত করা বিমানগুলোর দুই পাইলটকে উদ্ধার করা হয়েছে। একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, যাকে তেহরান খুঁজছে। প্রথম বিমানটি ছিল দুই আসনের একটি মার্কিন এফ-১৫ই জেট, যা ইরানে ভূপাতিত করা হয়। দ্বিতীয়টি, একটি এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমান। এটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে কুয়েতের আকাশে বিধ্বস্ত হয় এবং পাইলট বিমান থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। এ দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ধ্বংস হওয়া বিমানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত সাতটিতে। এদিকে নিখোঁজ পাইলটের সন্ধানে তল্লাশি অভিযানে অংশ নেওয়া দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারও ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে হামলার শিকার হেলিকপ্টারগুলো ইরানের আকাশসীমা থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। খবর : রয়টার্স, আলজাজিরা ও এনডিটিভি।
ইরানের সামরিক শক্তি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন দাবির মধ্যেই দুটি আধুনিক আমেরিকান সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান ‘সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন’ হয়ে গেছে, কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে ইরান এখনো পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। তাছাড়া একদিনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত ও দুটি হেলিকপ্টার হামলার শিকার হওয়া গত ২০ বছরের মধ্যে একটি বিরল ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম জানায়, আমেরিকান বিশেষ বাহিনী ভূপাতিত বিমানের দুই ক্রু সদস্যের একজনকে উদ্ধার করেছে, তবে অন্যজন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানের একটি সংস্করণ এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগলে একজন পাইলট এবং একজন অস্ত্র ব্যবস্থা কর্মকর্তা থাকেন। দুজনের মধ্যে কাকে উদ্ধার করা হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়।
যেভাবে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করছে ইরান : ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল বা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়েছে। তবে এগুলো প্রথাগত রাডার-ভিত্তিক ট্র্যাকিংয়ের বদলে অপটিক্যাল এবং ইনফ্রারেড (আইআর) সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলোতে থার্মাল ইমেজ বা তাপীয় ছবি দেখা গেছে।
এটি ইলেকট্রো-অপটিক্যাল/ইনফ্রারেড (ইও/আইআর) ট্র্যাকিং সিস্টেমের বৈশিষ্ট্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিখুঁত মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বেশির ভাগ রাডার-নির্ভর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তারা এখন এই ‘প্যাসিভ সেন্সর’-এর ওপর নির্ভর করছে। এই ইনফ্রারেড সিস্টেম বিমানের ইঞ্জিনের তাপ এবং ঘর্ষণের ফলে তৈরি হওয়া তাপ শনাক্ত করে কাজ করে। এতে কোনো তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ নির্গমন হয় না বলে বিমানগুলো আগে থেকে বুঝতে পারে না। অপারেটর যতক্ষণ না আকাশ থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী তাপের উৎসটি শনাক্ত করতে পারেন, ততক্ষণ এটি লক্ষ্য স্থির করে এবং একবার লক হয়ে গেলে চলমান তাপের উৎসটিকে অনুসরণ করে নিখুঁতভাবে আঘাত হানে।
বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এই হামলায় ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি স্বল্পপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘মজিদ’ (এডি-০৮) ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। ২০২১ সালের এপ্রিলে তৈরি এই সিস্টেমটি ‘আরাস-২’ ৪দ্ধ৪ ট্যাকটিক্যাল যানবাহনের ওপর বসানো থাকে। এটি কোনো রাডার ছাড়াই ১৫ কি. মি. দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে এবং ৮ কি.মি. পাল্লার মধ্যে অত্যন্ত নিচু দিয়ে উড়া বিমান, ড্রোন বা ক্রুজ মিসাইল ধ্বংস করতে সক্ষম। এর সর্বোচ্চ গতিবেগ মাক-২ এবং এটি ৭০০ মিটার থেকে ৬ কি. মি. উচ্চতায় আঘাত হানতে পারে। সিস্টেমটি একই সঙ্গে চারটি লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক ও আঘাত করতে সক্ষম, যা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে।
এর আগে একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল ইরান। গত (১৯ মার্চ) ইরানের আকাশে একটি অভিযানের সময় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে যুদ্ধবিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সেটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করেছে। তবে কোন ঘাঁটিতে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি।
৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান : যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ। একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার ইরানকে দুই দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়, যার জবাবে তেহরান তাদের হামলার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। তবে সেই প্রস্তাব বা এর সত্যতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য বা নিশ্চিত করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
৩৬৫ মার্কিন সেনা আহত : মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৩৬৫ জন মার্কিন সেনা অভিযানে আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৪৭ জন, নৌবাহিনীর ৬৩ জন, মেরিনের ১৯ জন, বিমানবাহিনীর ৩৬ জন রয়েছে। দেশবাসীর কাছে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলার ব্যাখ্যা দিতে গত বুধবার টেলিভিশনে হাজির হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেদিনের ভাষণে তিনি ইরানের ওপর তীব্র বোমাবর্ষণ করে দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন।
ইরানে বিরোধী দলের ২ সদস্যের মৃত্যুদ- : নিষিদ্ধ বিরোধী সংগঠন পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন অব ইরানের সদস্য হওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই ব্যক্তির মৃত্যুদ- কার্যকর করেছে ইরান। তারা হলেন, আবোলহাসান মন্তাজের এবং ভাহিদ বানিয়ামেরিয়ান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে চলতে থাকলেও ভিন্নমত দমন অভিযানের অংশ হিসেবে এটি সবশেষ পদক্ষেপ। গতকাল শনিবার সকালে তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয় বলে ইরানের বিচার বিভাগের ওয়েবসাইট মিজান অনলাইন এ তথ্য জানায়। এর আগে তাদের ‘একাধিক সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িত থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহে অংশগ্রহণ’-এর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছিল আদালত। পরে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত আগের রায় বহাল রাখে।
