সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। হাসপাতালগুলোয় আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এমন পরিস্থিতিতে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। এই কার্যক্রমের আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হবে। গতকাল শনিবার এক ভিডিওবার্তায় এ তথ্য জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
তিনি জানান, আজ রবিবার সকাল ৯টা থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় একযোগে এই বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এই কার্যক্রমের আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হবে। তবে যারা ইতিমধ্যে হাম বা জ্বরে আক্রান্ত রয়েছে, তাদের আপাতত এই টিকা দেওয়া হবে না। পরে যেসব জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে বা বেড়েছে, সেসব এলাকায় পর্যায়ক্রমে এই টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
ড. মুহিত বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। এই টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হামের বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি সব অভিভাবককে শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করতে এবং কর্মসূচিকে সফল করতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনকভাবে হামে ৭৮৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং একই সময়ে আরও চার জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৬০ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হামে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহজনক হাম রোগে ৭৮৭ জন আক্রান্ত এবং চার জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা মোট ৮২৬ জন এবং সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ছয় হাজার ৪৭৬ জন। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং সন্দেহজনক হামে ৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত মোট সুস্থ রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৬৫৪ জন।
দেশ রূপান্তরের রাজশাহী প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য বলছে ,রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৫ শিশু। হাসপাতালটিতে এখন হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৪৯ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। গতকাল দুপুরে হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৩৭৭ জন। আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৮ জন শিশু।
ডা. শংকর কে বিশ^াস জানান, রোগীর প্রচুর চাপের কারণে হামের রোগীদেরও দূরত্ব বজায় রাখা যাচ্ছে না। রোগী সংখ্যা যদি বাড়তেই থাকে তাহলে একটি শিশু ওয়ার্ডকে হামের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ড হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় হামের উপসর্গে ভর্তি হওয়া ৫ শিশুর মৃত্যু হলো। বিষয়টি নিশ্চিত করে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এসএম আনোয়ারুল ইসলাম।
কুষ্টিয়া জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল জানান, হাসপাতালগুলোয় শিশু ওয়ার্ডের সক্ষমতার তিনগুণ বেশি রোগী এবং রোগীদের সংগীয় লোকজনের ভিড়ে এ রোগের সংক্রমণে ঝুঁকি এখন চরম উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। এ ছাড়া নমুন পরীক্ষাসহ প্রকৃত হাম রোগী শনাক্তের বিষয়টি এখন পর্যন্ত একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই আছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় গোপালগঞ্জে ২৭ শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত ৯১ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে তুবা ইসলাম তোহা নামে ১০ মাসের এক কন্যাশিশু সম্প্রতি মারা গেছে। আর ৩ জনের হাম পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া গেছে। গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. জীবিতেশ বিশ্বাস জানান, আক্রান্তদের মধ্যে ১৯ জন গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি আছে। বাকি ৭১ জন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।
চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত সন্দেহে আরও ২৮ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় ২৬ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় ২ জন রোগী রয়েছেন। গতকাল চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯ জনে। এর মধ্যে মহানগর এলাকায় ৮৭ এবং উপজেলায় ২ জন রোগী রয়েছেন। তবে পরীক্ষার পর এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১২ জনের শরীরে, যাদের মধ্যে ৮ জন মহানগরের এবং ৪ জন উপজেলার বাসিন্দা। এই পর্যন্ত হাম লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে দুই শিশু।
সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, রোগ নির্ণয়ের জন্য শনিবার নতুন করে ৩১ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে।
