হ্যালির ধূমকেতু দর্শনের মতোই বিরল একটি ঘটনা ঘটেছে রবিবার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এর পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন ২০২৫-এর সময় ঘটে যাওয়া অনিয়ম, কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা খুঁজে বের করতে যে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটি ঘোষিত সময়ের ভেতরেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে! ১১ মার্চ তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়, একই চিঠিতে জানানো হয়, কমিটি ১৫ কার্যদিবসের ভেতরে প্রতিবেদন জমা দেবে। ঈদুল ফিতরের ছুটি, স্বাধীনতা দিবসের সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব মিলিয়ে ২৫ দিনের ভেতর ১৫তম কার্যদিবসেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। সদস্যদের একজন জানিয়েছেন, এই প্রতিবেদনটি সেলফ এক্সপ্লেনাটারি অর্থাৎ স্ব-ব্যাখ্যামূলক। প্রতিবেদনে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি, তবে কিছু পরামর্শ বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘আমরা যাদের সম্পৃক্ততা পেয়েছিলাম, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চেষ্টা করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে যা পেয়েছি, সেসব সুন্দরভাবে (প্রতিবেদন দেওয়ার) চেষ্টা করেছি। সংক্ষিপ্তভাবে কাউকে অভিযুক্ত না করে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনের সময় যা পেয়েছি, সে সম্বন্ধে প্রতিবেদন দিয়েছি।’
কী ধরনের সুপারিশ প্রতিবেদনে করা হয়েছে, জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা কিছু সুপারিশ করেছি। আমরা চেষ্টা করেছিলাম একটা সুপারিশ দেওয়ার জন্য যে (ভবিষ্যতে) নির্বাচনটা সুন্দর করার জন্য বা এই বোর্ড-সংক্রান্ত আর কোনো সুপারিশ করা যায় কি না, এই সম্পর্কে আমরা কিছু গাইডলাইন দেওয়ার চেষ্টা করেছি। গঠণতন্ত্র সংশোধনের ব্যাপার আছে।’
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাসিরুল ইসলাম, পেশাগত দায়িত্বে তিনি বাংলাদেশ পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের যুগ্ম কমিশনার। পেশাগত বৃত্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অনিয়মের তদন্তে অংশ নেওয়াটা তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। তবে কাজটা উপভোগ করেছেন এবং দীর্ঘ পুলিশ জীবনে তদন্তের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যাবতীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য অনেক তথ্যপ্রমাণ খুঁটিয়ে দেখেছেন বলেই জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। একজন সদস্য জানিয়েছেন, শুরু থেকেই যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যাপারে তারা ছিলেন বদ্ধপরিকর, যে কারণে সম্ভব হয়েছে। কতজনের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদন তৈরি করে হয়েছে, তার কোনো সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেননি কমিটি সদস্যদের একজন। তবে জানিয়েছেন কেউ সরাসরি সাক্ষাৎকারে সাড়া দিয়েছেন, কেউ লিখিত উত্তর পাঠিয়েছেন আবার কেউ ভার্চুয়ালি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বিসিবি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনারদের একজন ছিলেন সিআইডির সাবেক প্রধান মো. ছিবগাতউল্লাহ। তিনি সশরীরে উপস্থিত হয়েছিলেন কি না তদন্ত কমিটির ডাকে, এমন প্রশ্নে কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন, যেভাবেই সাড়া দিয়েছে সেটাই গ্রহণ করা হয়েছে।
বিসিবি নির্বাচনের সময়ে বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনেছিলেন। এনসিপির মুখমাত্র আসিফ নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, কেন তিনি তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দেননি, ‘আমি কেন বিসিবিসংক্রান্ত তদন্ত কমিটির সাক্ষাৎকারে সাড়া দিইনি প্রথমত, একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিসিবির ওপর এখতিয়ারবহির্ভূত ভাবে তদন্ত করছে মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয়ত, তদন্ত কমিটির প্রজ্ঞাপনেই সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, উচ্চ আদালতে বিচারাধীন একটি বিষয়ে তদন্ত করে তদন্ত কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট সবাই আদালত অবমাননা করছেন। চতুর্থত, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বোর্ড ডিরেক্টরদের পরের বোর্ডে ডিরেক্টর পদের লোভ, লোভে রাজি না হলে ভয় দেখিয়ে পদত্যাগ করাচ্ছেন। যখন আমাকে তদন্ত কমিটি থেকে সাক্ষাৎকারের বিষয়ে জানানো হলো। উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিষয় এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তারা তদন্ত করতে পারেন কি না জানতে চেয়ে কোনো সদুত্তর পাইনি। কীভাবে সরকার চালাতে হয়, কীভাবে প্রজ্ঞাপন দিতে হয়, কোনটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, কোনটা বিচারাধীন বিষয়, কোনটা আদালত অবমাননা এটা হয়তো আপনারা বোঝেন না অথবা তোয়াক্কা করেন না। ‘আমি তো আর জেনেবুঝে এসব নিয়মবহির্ভূত আর আদালত অবমাননার মতো কাজে শামিল হব না। এজন্যই বিসিবি সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির সাক্ষাৎকারের নোটিশে আমি সাড়া দেইনি।’ ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক রবিবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তদন্ত রিপোর্ট পাঠানো হবে আইসিসিতে, ‘ইতিমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আমাদের কাছে জমা হয়েছে। সুতরাং তিনি অংশগ্রহণ করেননি, নিশ্চয় সেই প্রতিবেদনের ভেতরে রয়েছে। আমরা সেটি যাচাই-বাচাই করেছি যে, তিনি উপস্থিত হননি, সেটা আমিও দেখেছি। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আমরা তাৎক্ষণিকভাবে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেছি। আইসিসিকে এই প্রতিবেদনের বিষয়ে অবহিত করার পরই আমরা ইনশাআল্লাহ পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’
তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হওয়ার পর বিসিবির সহসভাপতি ফারুক আহমেদই বলেছেন, প্রতিপক্ষবিহীন নির্বাচন হয়েছে। তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ঢাকার ক্লাব সংগঠকদের একটি অংশ তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন নির্বাচনের আগেই। ফলে ৭৬ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪২ জন। ক্লাব ক্যাটাগরিতে একাধিক ডামি প্রার্থী থাকায় মূলত নির্বাচনই হয়নি। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদে এসে অনেকেই বুঝতে পারছেন দেয়ালের লিখন। ২৫ জন পরিচালক এর মধ্যে ৭ জন পরিচালক পদত্যাগ করেছেন। আমিনুল ইসলাম যতই বলুন যে, তিনি শেষ ব্যক্তি হিসেবে থেকে যাবেন, আমিনুল হক খুব সম্ভবত সেটা হতে দেবেন না।
