দেশ-বিদেশে অসহায়ের সেবায় হাফেজ্জী চ্যারিটেবল

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০১ এএম

হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (এইচসিএসবি) আর্তমানবতার কল্যাণে নিবেদিত একটি সংস্থা। সংস্থাটি সারা দেশে বন্যার্তদের ত্রাণ, অভাবীদের খাদ্য সহায়তা এবং বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে। বিশেষ করে, বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল স্থাপন এবং গৃহহীনদের ঘর নির্মাণে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বাইরেও মানবিক সহায়তা প্রদান করে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি গাজা, সুদান ও বাংলাদেশে পরিচালিত সব মানবিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ অডিট রিপোর্ট, আর্থিক হিসাব, মাঠপর্যায়ের বিতরণ রসিদ এবং ডকুমেন্টেশন সংবাদমাধ্যমকে দিয়েছে হাফেজ্জী চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ। গত রমজানে দেশ-বিদেশের কোথায়, কোন খাতে কত টাকা দান করেছে, সেটিরও পূর্ণাঙ্গ আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়েছে সংস্থাটি।

২০২৩-২০২৫ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। দেখা গেছে, মানুষের দানের টাকার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব আছে সেখানে। কখন, কোথায় ও কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে, তারও স্বচ্ছ হিসাব আছে।

বাংলাদেশ সরকারের নিবন্ধিত সংস্থাটি পরিচালিত হচ্ছে দেশের বিজ্ঞ আলেমদের তত্ত্বাবধানে। জয়েন্ট স্টক নিয়ন্ত্রিত সংস্থাটি একই সময়ে বাংলাদেশ, গাজা ও সুদান, এই তিনটি অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক নানা সীমাবদ্ধতা ও জটিলতার কারণে যখন অনেক সেবামূলক সংস্থা কার্যক্রম পরিচালনায় বাধাগ্রস্ত, তখনো তারা গাজা ও সুদানের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং একটি অরাজনৈতিক মানবিক উদ্যোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজায় সংস্থাটির কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে। তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কাজের পাশাপাশি তাদের অন্যতম শক্তি হলো ভিডিও ডকুমেন্টেশন। অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ভিডিওগুলোতে স্বেচ্ছাসেবীরা সরাসরি তারিখ, স্থান, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং সহায়তার ধরন তুলে ধরছেন। গাজা ও সুদানের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক এই প্রমাণ সংরক্ষণ একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংস্থাটির প্রতিটি কার্যক্রম বৈধ কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা অনুযায়ী একজন ট্রাভেলার বছরে সর্বোচ্চ ১২ হাজার মার্কিন ডলার বহন করতে পারেন এবং সেই কাঠামোর মধ্যেই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সংস্থাটির আইন উপদেষ্টা সিনিয়র অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মুহসিন রশিদের আইনি পরামর্শ অনুসরণ করা হয়েছে। প্রতিটি লেনদেন, ট্রাভেল ডকুমেন্ট, রসিদ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংস্থার অফিসে সংরক্ষিত রয়েছে এবং তার একটি অংশ সংবাদমাধ্যমের কাছেও সরবরাহ করা হয়েছে।

এছাড়া সংস্থাটির সব ডকুমেন্টেশন নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং প্রতিবছরের অডিট রিপোর্টে তা যুক্ত করা হয়। ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টেও সেগুলো সংযোজনের প্রস্তুতি রয়েছে।

২০২৬ সালের রমজানে সংস্থাটি গাজায় ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯৩৭ টাকা এবং বাংলাদেশে ৩০ লাখ টাকার বেশি সহায়তা প্রদান করেছে। গাজা ও সুদান অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য ও ইফতার সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কাউন্সিলের মহাসচিব ডক্টর হানি ইবরাহিম এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জামিলা ইসমাইল সংস্থাটির কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন বলে জানা যায়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও সংস্থাটির কার্যক্রম প্রকাশিত হয়েছে। আল-জাজিরা, ফিলিস্তিন টেলিভিশন, বিবিসি এবং মিসরের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়েছে।

সংস্থাটি এজিপশিয়ান ইউথ কাউন্সিলের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্যক্রম আরও সমন্বিত হয়েছে।

দেশের ভেতরে সংস্থাটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য শিক্ষা, ফ্রি চিকিৎসা, ওষুধ বিতরণ, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, প্রতিবন্ধীদের সহায়তা এবং নির্যাতিত নারী ও অসহায় মানুষের জন্য সেফ হোম প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক রাজ বলেন, আমরা শুধু সহায়তা প্রদান করিনি, বরং প্রতিটি কার্যক্রমকে প্রমাণনির্ভর ডকুমেন্টেশনে রূপান্তর করে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছি। বাংলাদেশের মানবিক সেবার ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত