মূসক ও শুল্কে ছাড় দেবে না এনবিআর

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৪৪ এএম

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। এবারের বাজেটের আকার হতে পারে প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার। এ লক্ষ্যে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অংশীজনে সঙ্গে চলছে প্রাক-বাজেট আলোচনা। প্রতিদিন বিভিন্ন দাবির প্রস্তাবনা নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) হাজির হচ্ছেন খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এতে একদিকে বাজেট তৈরির প্রস্তুতি, অন্যদিকে আলাপ-আলোচনা। ফলে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবিতে রাজস্ব বোর্ডের সম্মতি থাকলেও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও আমদানি শুল্কে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। এমনকি সামনে নানা খাতের কর অব্যাহতি সুবিধাও তুলে দেওয়া হতে পারে বলে তিনি জানিয়েছন।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনের সম্মেলন কক্ষে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট উপলক্ষে কয়েকটি খাতের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এমন মন্তব্য করেন। এ সময় খাত-সংশ্লিষ্টরা তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের তুলনায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, গতবার থেকে ৫০ শতাংশ আয় বাড়াতে বলা হয়েছে। ৪ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় দরকার। বিশাল রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে সর্বোচ্চ ছাড় দেবে সরকার। টার্নওভার ট্যাক্স কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কর ফাঁকির কারণে নানাক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ভ্যাট রিফান্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দেড় বছর ধরে রিফান্ড দেওয়া হয়নি। অন্যায় করা হচ্ছে। আরও কিছুদিন এমন করা হবে। যতদিন সার্বিক কর্মকা- অনলাইন না হবে।

গতকালকের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশ অটোমোবাইলস অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএএএমএ); বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়ে (প্যাসেঞ্জার ক্যারিয়ার) অ্যাসোসিয়েশন (বিআইডব্লিউপিসিএ); বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএএমএ); বাংলাদেশ শিপ বিল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিএ); এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি); বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশন (বিআইসিডিএ); বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ);  বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস অ্যান্ড এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিডিডিএএ); বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বারভিডা); লঞ্চ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি) এবং বাংলাদেশ কার্গো ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিভিওএ) নেতারা। এ সময় নেতারা তাদের নিজ নিজ খাতের সমস্যা ও সুবিধার বিষয় তুলে ধরেন।

পরিবহন খাতের সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এবার গণপরিবহনে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়া হবে। আমরা চাই, রাস্তায় নতুন গাড়ি আসুক। স্কুল শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করতে বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

সভায় বারভিডা জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে গাড়ির নিবন্ধন কমে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে তারা সম্পূরক শুল্ক কমানোর দাবি তোলেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার ডিস্ট্রিবিউটর অ্যান্ড এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন তেল পরিবহনের ট্যাংকলরি আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের আবেদন জানায়। বিষয়টি জনস্বার্থে বিবেচনার আশ্বাস দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

এ ছাড়া বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন মোটরসাইকেলে সিএনজি ব্যবহারের অনুমতি চাইলেও গ্যাস সংকটের কারণে সে প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেননি আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে এবং এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, তাই নবায়নযোগ্য জ¦ালানির দিকে ঝোঁকার পরামর্শ দেন।

সভায় এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ জেট ফুয়েলের ওপর কর কমানোর দাবি জানায়। তারা জানায়, করের হার ১৮ টাকা থেকে বেড়ে ৪২ টাকায় পৌঁছেছে।

তবে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ফলে কর কমানোর সুযোগ সীমিত।

আলোচনায় বিপিআইএ পক্ষ থেকে এনবিআরের কাছে বেশকিছু দাবি তুলে ধরা হয়। এ সময় করপোরেট ট্যাক্স ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ, বিদ্যমান ১ শতাংশ টার্নওভার ট্যাক্স বাতিল, কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ, কাঁচামালের তালিকায় ডিওআরবি, চিটাগুড় এবং সয়াবিন মিল অন্তর্ভুক্ত করা, শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ক্ষেত্রে টিডিএস হার কমানো, পোলট্রি মৎস্য ও গবাদি পশুর খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ, প্যাকেজিং পণ্য ও কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে আগাম কর প্রত্যাহারসহ বেশ কিছু দাবি তুলে ধরা হয়। 

এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের এই পোলট্রি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে চলতি বছরে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক খামারে। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের অঙ্ক না মেলায় খামার বন্ধ করে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার খামারি। অথচ বাংলাদেশের আশপাশে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পরিস্থিতি উল্টো। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পোলট্রি খাতে করপোরেট কর এখন সবচেয়ে বেশি। আসন্ন বাজেটে পোলট্রির শিল্পের ওপর করের বোঝা কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

সংগঠনটির সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী জানান, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোনো খাতের সঙ্গে এত উচ্চ কর নেই। বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো কর অব্যাহতি দিয়ে উদ্যোক্তা ও খামারিদের সহায়তা দিয়ে থাকে। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে আমরা উল্টোটা করছি। চলতি বছরের বাজেটে একলাফে করপোরেট কর ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধির পাশাপাশি সব ধরনের কর ও শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় দফায় দফায় পোলট্রির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, এর প্রভাব কিন্তু ইতিমধ্যে উৎপাদনকারীদের ওপর পড়া শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে এই প্রভাব বাজার ও ভোক্তাদের ওপর পড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের সুরক্ষা এবং পোলট্রি শিল্পকে এগিয়ে নিতে বর্তমানের কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসা জরুরি। নইলে প্রান্তিক খামারিদের আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। আর প্রান্তিক খামারি না থাকলে এ শিল্প পুরোটাই বড় করপোরেট কোম্পানির অধীনে চলে যাবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত