কুয়ালালামপুরের দৃষ্টিনন্দন টেরিটরি মসজিদ

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ এএম

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর ভ্রমণে আসা পর্যটক কিংবা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে অন্যতম আকর্ষণের নাম ফেডারেল টেরিটরি মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে মসজিদ উইলায়া পারসেকুতুয়ান নামে পরিচিত। আধুনিক নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতাকে একপাশে ঠেলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অনন্য স্থাপত্যের এই মসজিদটি। এর প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে ঐতিহ্যের গভীর স্পন্দন, যা মুহূর্তেই দর্শককে এক শান্ত মুগ্ধতার ঘোরে আচ্ছন্ন করে ফেলে। পাথরের গায়ে খোদাই করা কারুকাজগুলো যেন এক অপার্থিব সুন্দরের গল্প বলে চলেছে।

জালান দুতা এলাকার ম্যাট্রেড কমপ্লেক্স এবং সরকারি দপ্তরগুলোর কোলঘেঁষে এর অবস্থান। প্রায় ১২ একর বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই মসজিদটি অনন্য নির্মাণশৈলীর জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। ১৯৯৮ সালে এই শৈল্পিক স্থাপত্যের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং দীর্ঘ দুই বছরের পরিশ্রমে ২০০০ সালে তা সমাপ্ত হয়।

২০০০ সালের ২৫ অক্টোবর এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। মালয়েশিয়ার তৎকালীন রাজা তুয়াঙ্কু সৈয়দ সিরাজ উদ্দিন ইবনে আল-মারহুম সৈয়দ পুত্রা জামালুলাইল এটি উদ্বোধন করেন। এটি কুয়ালালামপুর শহর সীমানার মধ্যে নির্মিত ৪৪তম সরকারি মসজিদ। ফেডারেল টেরিটরি রিলিজিয়াস ডিপার্টমেন্ট এই মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে।

স্থাপত্যের দিক থেকে এই মসজিদটি এক বিস্ময়কর উদাহরণ। এর নকশায় মূলত তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত ‘ব্লু মসক’ বা সুলতান আহমেদ মসজিদের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। উসমানীয় সাম্রাজ্যের নির্মাণশৈলীর সঙ্গে মালয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী কারুকার্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এখানে লক্ষ্য করা যায়। মসজিদের ছাদজুড়ে শোভা পাচ্ছে মোট ২২টি বিশালাকার গম্বুজ। এই গম্বুজগুলোর নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে গ্লাস ফাইবার এবং ইপোক্সি রেজিনের এক বিশেষ সংমিশ্রণ, যা গম্বুজগুলোকে একই সঙ্গে অত্যন্ত মজবুত, দীর্ঘস্থায়ী এবং ওজনে হালকা করেছে। দিনের আলো যখন এই নীল গম্বুজগুলোর ওপর পড়ে, তখন এক স্নিগ্ধ আভা ছড়িয়ে পড়ে পুরো চত্বরে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয়, আকাশের একটি অংশ যেন মাটির বুকে নেমে এসেছে।

মসজিদটির ভেতরের কারুকাজও সমানভাবে নজরকাড়া। এখানে প্রবেশের পর যে কেউ এর বিশালতা দেখে অভিভূত হতে বাধ্য। এখানে একইসঙ্গে প্রায় ১৭ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। নামাজের প্রধান হলের সিলিং এবং দেওয়ালে থাকা নকশাগুলোতে সূক্ষ্ম শৈল্পিক দক্ষতার ছাপ পাওয়া যায়। মালয়েশিয়ার দক্ষ কাঠমিস্ত্রিদের হাতে খোদাই করা কাঠের নকশাগুলো এই মসজিদের আভিজাত্যকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। আধুনিক নির্মাণ কৌশলের পাশাপাশি এতে ঐতিহ্যবাহী মালয় নকশা ব্যবহার করা হয়েছে, যা দেশটির নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয় দেয়।

মসজিদের চারপাশের পরিবেশও অত্যন্ত মনোরম। চারপাশের বাগান এবং সুবিন্যস্ত ফোয়ারাগুলো এখানে এক প্রশান্তিময় পরিবেশ তৈরি করে। পানির কলকল ধ্বনি আর স্থাপত্যের শুভ্রতা মিলে এক আধ্যাত্মিক আবহ সৃষ্টি হয়। কেবল ইবাদতের স্থান হিসেবেই নয়, এই মসজিদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ইসলামী শিক্ষা ও প্রচারের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়মিত পরিচালিত হয়।

এখানে পর্যটকদের জন্য বিশেষ গাইডের ব্যবস্থা রয়েছে, যারা এই স্থাপনার ইতিহাস, স্থাপত্য এবং ইসলামের প্রাথমিক বিষয়গুলো দর্শনার্থীদের কাছে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেন। অমুসলিম পর্যটকদের জন্যও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এর অনন্য সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। যারা স্থাপত্য ভালোবাসেন কিংবা যারা আধ্যাত্মিক প্রশান্তি খুঁজছেন, তাদের জন্য ফেডারেল টেরিটরি মসজিদ একটি আদর্শ গন্তব্য।

স্থাপত্যের আভিজাত্য, পরিবেশের স্নিগ্ধতা এবং ঐতিহ্যের মেলবন্ধন, সব মিলিয়ে ফেডারেল টেরিটরি মসজিদ কেবল একটি ভবন নয়, বরং এটি কুয়ালালামপুরের এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। এর বিশাল চত্বরে দাঁড়ালে যেমন সময়ের হিসাব ভুলে যেতে হয়, তেমনি এর গম্বুজের নীল রঙ মনের গহিনে এক অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। আধুনিক যুগের নির্মাণশৈলী যে কত সুন্দরভাবে প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যেতে পারে, এই মসজিদটি তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে থাকবে।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত