যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এবার কার্যকর শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছে দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারা। চরম অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই আলোচনা সফল হলে থামতে পারে হাজার হাজার মানুষের প্রাণঘাতী এক যুদ্ধ। আগামীকাল শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে হবে দুই দেশের সরকারপর্যায়ের এই বৈঠক। সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার আগে রাজধানীর নিরাপত্তা জোরদারে ইসলামাবাদে ২ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। তবে কড়া নিরাপত্তার আড়ালে পর্দার অন্তরালে চলছে ব্যস্ত কূটনৈতিক তৎপরতা। এই শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বিপরীতে ইরানি পক্ষের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এই বৈঠকের দিকে নজর থাকবে পুরো বিশ্বের; কেননা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধকালীন সরবরাহ কমে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন প্রায় প্রতিটি দেশেরই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেও লেবাননে নির্মম এবং অস্বাভাবিক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। হোয়াইট হাউজও বলেছে, এই যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে তেহরান বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। লেবানন যুদ্ধবিরতির ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান লেবাননের জনগণকে ছেড়ে যাবে না। ফলে প্রত্যক্ষ আলোচনার আগেই যুদ্ধবিরতি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। আলোচনায় অংশ নিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের সঙ্গে থাকবেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। ২০১১ সালের পর ভ্যান্সই হবেন পাকিস্তান সফরকারী যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এরই মধ্যে ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেল খালি করে অতিথিদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম জানিয়েছেন, স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এক্স পোস্টে তিনি বলেন, ইসরায়েলি সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ ‘ভ-ুল করার’ প্রচেষ্টা নিয়ে ইরানিদের মধ্যে সংশয় থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিধিদলটি এই সফরে যাচ্ছে। আলোচনার টেবিলে বসার আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতি এবং ‘ইসরায়েলের মাধ্যমে চলমান যুদ্ধের’ মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে বলে সতর্ক করেছে ইরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্স-এ লিখেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো পরিষ্কার এবং সুনির্দিষ্ট; যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বেছে নিতে হবেযুদ্ধবিরতি না কি ইসরায়েলের মাধ্যমে চলমান যুদ্ধ। তারা একই সঙ্গে উভয়টি করতে পারে না। লেবানন পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে আরাগচি আরও বলেন, বিশ্ববাসী লেবাননের এই গণহত্যা দেখছে। এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে এবং বিশ্ব তাকিয়ে আছে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করে কি না। এর আগে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছিল, ইসরায়েল লেবাননে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন অব্যাহত রাখলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই সমঝোতা থেকে সরে দাঁড়াবে।
তবে, লেবানন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেস্তে না দিতে ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত হবে ইরানের জন্য চরম বোকামি। গত বুধবার হাঙ্গেরি ত্যাগ করার সময় সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, যে সংঘাতে ইরান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, সেই সংঘাত বন্ধের আলোচনা যদি লেবাননকে কেন্দ্র করে তারা ভেস্তে দিতে চায়, তবে তা হবে তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত। যদিও লেবাননের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বলেনি যে লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অংশ। আমরা মনে করি এটা বোকামি, কিন্তু সিদ্ধান্ত তাদের। তবে এটা বলাই যায় যে, এই শান্তি আলোচনা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ২০০ মানুষ নিহত ও ১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। হামলার পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ হয়ে গেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ শান্তি প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে হরমুজ প্রণালি খোলা নাকি বন্ধ সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে, ইরান যতক্ষণ পর্যন্ত ‘চুক্তি’ পুরোপুরি মেনে না চলবে, ততক্ষণ ওয়াশিংটনের সামরিক বাহিনী দেশটির আশপাশে অবস্থান করবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনো ধরনের চুক্তি লঙ্ঘিত হলে এর আগে কখনো দেখা যায়নি, এমন ভয়াবহ সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। গত বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সব জাহাজ, বিমান ও সামরিক কর্মী ইরানের আশপাশে থাকবে, যতক্ষণ না বাস্তব চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলা হয়। যদি কোনো কারণে তা না হয়, তবে হামলা, যা হবে আগের চেয়ে বৃহৎ, তীব্র ও শক্তিশালী; যা আগে কেউ কখনো দেখেনি। ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করতে এবং হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখতে সম্মত হয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, এদিকে আমাদের মহান সামরিক বাহিনী সমরাস্ত্র প্রস্তুত করছে এবং বিশ্রাম নিচ্ছে; আসলে তারা পরবর্তী বিজয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। পোস্টের শেষে তিনি ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ফিরে এসেছে!
