সিডরে ফেরির পন্টুন ভেসে যাওয়ার দুই দশকেও চালু হয়নি বলেশ্বর নদের কলারন-সন্ন্যাসী ফেরি চলাচল। নদীটি খরস্রোতা হওয়ায় পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলার ৩টি উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ নৌকাযোগে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে নদী পারাপার হচ্ছেন। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা পড়েছে সবচেয়ে বেশি বিপদে। তাই দ্রুত ফেরি চালুর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
জানা গেছে, পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলা ও বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বলেশ্বর নদীর ওপর কলারন-সন্ন্যাসী ফেরিটি ২০০৬ সালে চালু হয়। ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে সিডরের আঘাতে কলারন প্রান্তের ফেরিঘাটের পন্টুনটি স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার আর ফেরিটি পুনঃস্থাপন করে রুটটি চালু করার উদ্যোগ নেয়নি। এদিকে ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনের পরে কর্তৃপক্ষ ফেরিটি পুনঃস্থাপন করে রুটটি চালুর উদ্যোগ নিলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
স্থানীয়রা জানান, কলারন-সন্ন্যাসী ফেরি চালু হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুই দশক সুন্দরবন ও মংলা বন্দরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এই ফেরিটি চালু থাকলে সরাসরি ঢাকা থেকে শরণখোলা উপজেলা ও সুন্দরবনে পর্যটকসহ সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতে পারত। অপরদিকে সুন্দরবনের আহরিত মধু, কাঠসহ অন্যান্য কাঁচামাল এবং বঙ্গোপসাগর থেকে জেলেদের ধরা মাছ কম খরচে দেশের যে কোনো স্থানে পাঠানো সম্ভব হতো। এছাড়া সড়কপথে সুন্দরবন থেকে সরাসরি ঢাকাসহ দেশের যে কোনো স্থানে যাত্রী পরিবহনসহ মালামাল সরবরাহ সহজ হতো। পাশাপাশি মংলা বন্দরের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের পর্যটন শিল্প সমৃদ্ধ হওয়াসহ সুন্দরবনের বনজ সম্পদ ও বঙ্গোপসাগর উপকূলের মাছ দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা সম্ভব হতো।
বর্তমানে ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাধ্যমে এই নদীটি পারাপার হতে হয়। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নৌকা বন্ধ থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুই পাড়ের যাত্রীদের বসে থাকতে হয়। এতে সময়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ব্যাহত হচ্ছে।
পথচারী মিজান, রহিম ও হালিম জানান, দুই দশক বন্ধ হয়ে আছে পিরোজপুরের কলারন ফেরিঘাট। বারবার আশ্বাস দিয়েও চালু হয়নি ফেরি চলাচল। ফলে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন নদী পারাপার হচ্ছে এই রুটে চলাচলকারী হাজারো যাত্রী।
শামীম জমাদ্দার নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, নদীটি পার হতে ট্রলারই একমাত্র ভরসা, যা বর্ষা মৌসুমে ও বৈরী আবহাওয়ায় প্রায়ই বন্ধ থাকে। বারবার আশ্বাসের পরও অজানা কারণে চালু হয়নি ফেরি চলাচল। ফলে অসুস্থ রোগী ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন। তাদের দাবি হাজারো মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে আবারও এই ফেরি চালু করা হোক।
আসমা আক্তার নামে একজন এনজিওকর্মী বলেন, ‘শরনখোলায় একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করার কারণে পিরোজপুর থেকে এই রুটে যাতায়াত করি। সব সময় ট্রলার না থাকার কারণে আমাদের অনেক সময়ই ভোগান্তিতে পড়তে হয়।’
তরিকুল ইসলাম নামের এক পথচারী বলেন, ‘এই ঘাটটি আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ফেরি না থাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এছাড়াও এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকা- এই ফেরিটির কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে।’
জিয়ানগর উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘ফেরিটি চালু হোক এটা দক্ষিণাঞ্চলের তিন উপজেলা জিয়ানগর, মোড়েলগঞ্জ ও শরনখোলার মানুষের প্রাণের দাবি। এই ফেরিটি পুনরায় চালু হলে মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজসহ ব্যবসা-বাণিজ্য ও বাজারব্যবস্থা সচল হবে। এতে স্থানীয়রা অর্থনৈতিকভাবেও উপকৃত হবেন।’
এ বিষয়ে পিরোজপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহম্মেদ বলেন, ‘জিয়ানগর থেকে কলারন পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য শিগগির দরপত্র আহ্বান করা হবে। পাশাপাশি বাগেরহাট প্রান্তের রাস্তা প্রশস্তকরণের কাজ শেষ হলেই দুই প্রান্তের পন্টুন পুনঃস্থাপন করে ফেরি চালু করা হবে।’
পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাইদী বলেন, ‘দ্রুত ফেরি চালুর বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন এবং পিরোজপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেছি। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কলারন থেকে টগড়া পর্যন্ত রাস্তাটি ২০ ফুট প্রশস্ত করার জন্যও অনুরোধ করেছি।’
