সংসদে অর্থমন্ত্রী

জ্বালানিতে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪০ এএম

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে, যা বাজেট ও রিজার্ভ দুটির ওপরই চাপ তৈরি করবে। এই ভর্তুকি একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর দিকে যাবে, অন্যদিকে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলবে। গতকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে দেওয়া বিবৃতিতে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। মন্ত্রী তার বক্তব্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা আর্থিক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির চিত্র উঠে আসে। সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালের আর্থিক খাতের চিত্রও বর্ণনা করেন অর্থমন্ত্রী।

আমির খসরু বলেন, ‘একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই বাস্তবতার বাইরে নয়। এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনগণকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে অতিরিক্ত ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন হলেও সরকার জনগণের কষ্টের কথা মাথায় রেখেছে। এখন পর্যন্ত পূর্ণ সমন্বয় না করে আগের মূল্যই বহাল রেখেছে। এই প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্যে আমাদের অর্থনীতিকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। আমরা অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা স্থাপন ও নানামুখী চাপ মোকাবিলা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। ফলে জনগণ সেই বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল ভোগ করতে পারছে না। এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, সরকারি ক্ষেত্রে একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, যেখানে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং তুলনামূলক উচ্চ সুদের ব্যয় সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে। অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো গভীর ও বহুমাত্রিক। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুশাসন, সংস্কার এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি ও আমদানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১০.৫ বিলিয়ন ও ১৩.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২১.৬ ও ১২.২ শতাংশ। এ ছাড়া রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪.৮ বিলিয়ন ও ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ২০২৩-২৪ সালে রপ্তানি ও আমদানি বেড়ে যথাক্রমে ৪০.৮ ও ৬৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও এই দুটি সূচকের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক।

আমির খসরু বলেন, আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে বড় ব্যবধানের কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় রেমিট্যান্স বেড়ে ২৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ালেও হুন্ডি প্রবাহ বা অর্থ পাচারের কারণে রিজার্ভের পরিমাণ কমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় (৩০.৩ বিলিয়ন ডলার), যা রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩.২ বিলিয়ন ডলার।

১৬ বছরের দুর্নীতি-লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকারের দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় এনে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, বিগত ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধূলিসাৎ করা হয়েছে। আমি বিগত সরকারের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর বাস্তব চিত্র দেশবাসীকে জানাতে চাই।

২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নেওয়া লক্ষ্য

এদিকে সংসদে সরকারি দলের সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের (ঢাকা-১৮) লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি ও স্পোর্টস অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত