দেশে দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের ফলে নারীরা অনলাইনভিত্তিক নানা ধরনের ঝুঁকি ও হুমকির মুখে পড়ছেন। এ বাস্তবতায় সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি লিঙ্গভিত্তিক ও অনলাইন সহিংসতা, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এবং জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ডিজিটাল নিরাপত্তাকে নারীদের জন্য একটি নতুন ও জটিল ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, ঘৃণামূলক বক্তব্যসহ বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারীরা। এর ফলে তাদের মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনলাইন মাধ্যমে অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হয়ে পড়ছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, সাইবার বুলিং বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। এটি ছাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়ার হার বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
এ কারণে নারীর ক্ষমতায়ন কৌশলের অংশ হিসেবে সরকার লিঙ্গভিত্তিক ও অনলাইন সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান গ্রহণ করেছে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও লিঙ্গভিত্তিক ও অনলাইন সহিংসতা, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনলাইন হয়রানি, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং ডিজিটাল বুলিং প্রতিরোধে সরকার কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাবিত উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে সাইবার সহিংসতা ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন, সাইবার অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা। পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিপীড়ন কমাতে পৃথক গোয়েন্দা ইউনিট এবং সাইবার ক্রাইম ট্র্যাকিং সিস্টেমসহ বিশেষায়িত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল সহিংসতা প্রতিরোধে গণমাধ্যম ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে। একই সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ নারী-বান্ধব সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ডেটা সুরক্ষা ও তথ্য নিরাপত্তা বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় ডিজিটাল নিরাপত্তাও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ‘সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও নিপীড়ন হ্রাস’ শীর্ষক কর্মসূচির জন্য ১৬৭ দশমিক ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন শ্রমবাজার গঠনে নারী ও শিশু-বান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের ওপর যে কোনো ধরনের সহিংসতা বা যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।’
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বন্ধ এবং নারীদের অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় কোনো নারী যেন পিছিয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, নারী ও পুরুষের ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনায় সরকারি সম্পদের সুষম বণ্টন এবং কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘জেন্ডার বাজেটিং’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সঙ্গত ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা।
এদিকে, ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটি গত ১৫ জুলাই সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে বৈঠক করে।
বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা এবং ডিজিটাল সেবার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে খসড়া আইনটিকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ অনুমোদন করা হয়েছে।