৪ বছরে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির পথে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩২ এএম

ছয় দশকের মধ্যে এক মাসে জ্বালানি তেলের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। গত মাসের এই পরিস্থিতি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ এবং হোয়াইট হাউজের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ২.৪ শতাংশ থাকলেও মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৩ শতাংশে। এটি ২০২৪ সালের মে মাসের পর এক বছরে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ড। আর মাসিক ভিত্তিতে গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ০.৯ শতাংশ দাম বেড়েছে।

মূলত ইরান যুদ্ধের প্রভাব মূল্যস্ফীতির এই তথ্যে প্রথমবারের মতো ফুটে উঠেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে, যার ফলে খাদ্য ও বাড়ি ভাড়ার মতো মৌলিক চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাতগুলো বাদ দিলে মূল মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ২.৬ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২.৫ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি যে বাড়বে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত মাসের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির বড় কারণ ছিল জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। পাম্পের পেট্রোলের দামে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ, ১৯৬৭ সালে হিসাব রাখা শুরু হওয়ার পর যা সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। একই সময়ে ভারী তেলের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, ২০০০ সালের পর সবচেয়ে বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় প্রশ্ন হলো জ্বালানির এই উচ্চমূল্য কতদিন স্থায়ী হবে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ মাইকেল পিয়ার্স বলেন, নিকট ভবিষ্যতে এটি যন্ত্রণাদায়ক; এপ্রিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, এটি দীর্ঘস্থায়ী না হয়ে একটি সাময়িক ‘ধাক্কা’ হিসেবে থাকতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়ায় এর প্রভাব পড়েছে অন্যান্য খাতেও। বিশেষ করে বিমান ভাড়ায় খরচ বেড়েছে এবং ইউপিএস বা ফেডেক্সের মতো ডেলিভারি সার্ভিসগুলো বাড়তি জ্বালানি মাশুল যুক্ত করেছে। যদিও গত মাসে মুদি পণ্যের দাম সামান্য কমেছে, তবে ডিজেলের দাম বাড়তে থাকায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধির আশঙ্কায় সামনে এ দাম বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পোশাকের দাম মার্চে বেড়েছে ১ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের প্রলেপ তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করায় ফেডারেল রিজার্ভ সম্ভবত সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেবে। অন্যদিকে, মিশিগান ইউনিভার্সিটির এক জরিপ অনুযায়ী, ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। এপ্রিল মাসে ভোক্তাদের আস্থা রেকর্ড স্তরে নেমে এসেছে।

আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এপি-এনওআরসি-এর জরিপ বলছে, প্রায় ৬০ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক জ্বালানি তেলের খরচ মেটানো নিয়ে উদ্বিগ্ন। উইসকনসিনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কাইল লা ফন্ড জানান, তার শিপিং খরচ ইতিমধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। টিকে থাকার জন্য তিনি পণ্যের দাম বাড়ানোর কথা ভাবছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ৪.১৫ ডলার, যা যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২২ সালের তুলনায় এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন কারণ বর্তমানে শ্রমবাজার এবং ভোক্তাদের ব্যয় করার সক্ষমতা আগের চেয়ে কিছুটা দুর্বল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত