পহেলা বৈশাখে নতুনকে আহ্বানের মাধ্যমে প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে সারা দেশ। এই উৎসবের সবচেয়ে প্রাণবন্ত রূপ ফুটে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে। বৈশাখ এলেই ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রঙের উৎসব আর সংস্কৃতির আবহ। নানা আয়োজন, শোভাযাত্রা ও ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় শিক্ষার্থীরা হয়ে ওঠে বৈশাখী রঙে রঙিন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই উদযাপনের গল্প শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জেনেছেন ওসমান গনি
ঢাবির বৈশাখ রঙ, সুর আর তারুণ্যের উৎসব
বাংলা নববর্ষ মানেই নতুন সূচনা ও আশার বার্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয় সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে। দিনটির প্রধান আকর্ষণ ভোরবেলার চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা। ভোর থেকেই শিক্ষার্থীরা লাল-সাদা পোশাকে আর বাহারি সাজে মিলিত হয় বন্ধুদের সঙ্গে। টিএসসি, কার্জন হল ও কলা ভবনে বিরাজ করে এক সাংস্কৃতিক পরিবেশ। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি ও লোকসংগীতে মুখর থাকে চারপাশ। দুপুর থেকেই ক্যাম্পাসজুড়ে বসে বৈশাখী মেলা, যেখানে নানান রকম পিঠাপুলি, বাঙালি খাবার, বাঙালি সাজসজ্জার জিনিস আর তৈজসপত্র পাওয়া যায়। নাগরদোলা আর দেশীয় কিছু খেলাধুলা মেলায় যোগ করে নতুন মাত্রা। এ ছাড়াও এই দিনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে থাকে বিশেষ খাবারের আয়োজন। এই উদযাপন বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐক্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
বিথী খাতুন
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রিয়জন হতে দূরে বিদ্যায়তনের বৈশাখ
পহেলা বৈশাখ বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্য। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত হয়েছিল বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন। মূলত পুরনো বছরের হিসাব চুকিয়ে নতুনের শুরু করতেই দিনটি। পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালির সকাল শুরু সপরিবারে পান্তা, ইলিশ বিভিন্ন পদের ভর্তা তিতকুটে শাক আর মিষ্টির মেলবন্ধনে। কিন্তু পরিবার হতে শিক্ষার্জনের জন্য যারা দূরে থাকে তাদের বৈশাখ কেমন হয়? আমি জানাতে পারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখ কীভাবে উদযাপিত হয় তা। সকালে শিক্ষার্থীরা লাল, সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে প্রিয়জনদের সঙ্গে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। চারুকলা অনুষদ কর্তৃক তৈরি পাখির মুখোশ, টেপা পুতুল, বাঘের মুখোশ নানা রঙে রঙিন করে তোলে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। ক্যাম্পাস জুড়ে বসে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বৈশাখী মেলা ‘বৈশাখীয়ানা’। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, কাচের চুড়ি, মুড়ি মুড়কি, জিলিপি যেন মনে করিয়ে দেয় ছোট্ট বেলার কথা।
শারমিন শিলা রহমান
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
নজরুল তীর্থে বৈশাখ উদযাপন
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পহেলা বৈশাখ আমার কাছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক মহোৎসব। এ দিন পুরো ক্যাম্পাস জেগে ওঠে বর্ণিল র্যালি, লোকজ সাজ আর প্রাণবন্ত আয়োজনে। লাল-সাদা পোশাকে শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, সঙ্গে থাকে বৈশাখী গান, নৃত্য ও কবিতার সুরেলা আবহ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বসে মনোমুগ্ধকর মেলা, যেখানে নানা স্টল, হস্তশিল্প আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমারোহ মুগ্ধ করে সবাইকে। আশপাশের এলাকার মানুষও পরিবারসহ এখানে ঘুরতে আসে, মিলিত হয় এক আনন্দমুখর মিলনমেলায়। সবুজে ঘেরা নজরুল তীর্থ তখন রূপ নেয় এক জীবন্ত ছবিতে। এই উৎসব আমাদের শিকড়ের টানে আবদ্ধ করে, জাগিয়ে তোলে নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। দিনটি শেষ হলেও এর রেশ থেকে যায় দীর্ঘদিন, মনে রেখে যায় ভালোবাসা, ঐতিহ্য আর গর্বের অমলিন স্মৃতি। এভাবেই বৈশাখ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়ে ওঠে প্রাণের উৎসব।
শোভন বিশ্বাস
শিক্ষার্থী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
শৈশবের মেলা থেকে ক্যাম্পাসের বৈশাখ
শৈশব থেকে পহেলা বৈশাখ আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। ভোরে উঠে পান্তা-ইলিশ খেয়ে মাটির ব্যাংক ভেঙে খুচরা টাকা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছুটতাম গ্রামের বৈশাখী মেলায়। বটগাছতলায় বসা সেই মেলায় বাতাসা, বাঁশি, পুতুল কিনতে কিনতেই পকেট খালি হয়ে যেত আর দিনভর আনন্দে ভরে উঠত মন।
এখন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতিতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন সাধারণত আমার পহেলা বৈশাখগুলো কাটে আমার প্রিয় ক্যাম্পাসে। তবে এখানেও প্রশাসন আর শিক্ষার্থীদের উদ্যেগে নানা আয়োজন উৎসবের মধ্য দিয়ে করা হয় বর্ষবরণ। সকালের শুরুটাই হয় আনন্দ র্যালির মধ্যে দিয়ে। সেখানে ছেলেরা রঙবেরঙের পাঞ্জাবি আর মেয়েরা উপস্থিত হয় বাহারি রঙের শাড়িতে। কেউ কেউ পরম যত্নে খোপায় গুঁজে রাখে নানান ফুল। হাসি আর অট্টহাসিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বাঁধভাঙা জোয়ার।
বুদ্ধিজীবী চত্বরে বসে মেলার আদলে স্টল। কেউ বসে নিজ হাতে বানানো পিঠা নিয়ে তো কেউ বসে শৈল্পিক ধাঁচের ঘর সাজানোর সামগ্রী নিয়ে। দুপুরে আয়োজন করা প্রীতিভোজের। প্রীতিভোজের পরেই থাকে সবচেয়ে বড় চমক; বিখ্যাত ‘জব্বারের বলি খেলা’। সেকি উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে এই বলি খেলাকে কেন্দ্র করে। সবশেষে রাতে খোলা আকাশের নিচে বসে মুক্ত মঞ্চের আয়োজনগুলো দেখতে দেখতে কখন যেন হারিয়ে যায়; আবার নিজেকে খুঁজে পেতে ইচ্ছে করে সেই ছোট বেলার গ্রামীণ মেলার মাঝে।
আহমেদ সাব্বির
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
