কুমিল্লা অঞ্চলের রেলপথজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অরক্ষিত ও অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিংগুলো দিন দিন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকলেও প্রতিদিন হাজারো মানুষ এসব ক্রসিং ব্যবহার করছেন। গত পাঁচ বছরে এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে অন্তত ৩৫৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। প্রায় ১৮৬ কিলোমিটার রেলপথে ১১৬টি অরক্ষিত ক্রসিং থাকায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ ক্রসিংগুলোর অনেকটিতেও নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা বা দায়িত্বশীল গেটম্যান। ফলে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে অধিকাংশ লেভেল ক্রসিংই এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবশেষ গত ৩০ মার্চ বিকেলে লালমাই উপজেলার দত্তপুর এলাকায় ট্রেনের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে সুমন নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। এর আগে ২১ মার্চ রাতে পদুয়ারবাজার রেলক্রসিং এলাকায় ভয়াবহ দুর্ঘটনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে লক্ষ্মীপুরগামী ‘মামুন স্পেশাল’ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নারী-শিশুসহ ১২ জন নিহত হন এবং আহত হন অন্তত ১৫ জন। এ ঘটনা নতুন করে রেলক্রসিং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে বুড়িচং উপজেলার কালিকাপুর এলাকায় একটি অরক্ষিত ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় অটোরিকশার সাত যাত্রী নিহত হন। ২০২৩ সালে মনোহরগঞ্জ উপজেলার তুগুরিয়া এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ট্রেনের ধাক্কায় পাঁচজন মারা যান। ২০২২ সালের ৯ মার্চ সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুরে ট্রেনে কাটা পড়ে তিন স্কুলছাত্রী নিহত হয়।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, লাকসাম-নোয়াখালী, লাকসাম-চাঁদপুর এবং লাকসাম-আখাউড়া রেলপথজুড়ে বিপুলসংখ্যক বৈধ ও অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। লাকসাম-নোয়াখালী রুটের ৪৯ কিলোমিটারে ১৯টি বৈধ ও ৪২টি অবৈধ, লাকসাম-চাঁদপুর রুটের ৫১ কিলোমিটারে ২৩টি বৈধ ও ৩৬টি অবৈধ এবং লাকসাম-আখাউড়া রুটের ৭২ কিলোমিটারে ৩৩টি বৈধ ও ৩৮টি অবৈধ ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩২টি ক্রসিং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মিত সড়কের সঙ্গে যুক্ত। বাকি ক্রসিংগুলো পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সড়কের কারণে তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যথাযথ সমন্বয় ছাড়াই এসব সড়ক নির্মাণ করায় ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং তৈরি হয়েছে।
লাকসাম রেলওয়ে থানা সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে, যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে কিংবা অসতর্কভাবে রেললাইন পার হতে গিয়ে অন্তত ৩৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন আরও অনেকে। বছরভিত্তিক হিসাবে ২০২১ সালে ৪১, ২০২২ সালে ৭১, ২০২৩ সালে ৬৮, ২০২৪ সালে ৭০, ২০২৫ সালে ৭৫ এবং চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৩০ জন নিহত হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক অরক্ষিত ক্রসিংয়ে অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং, নিজ দায়িত্বে পারাপার হোন এমন সাইনবোর্ড টানিয়ে দায় এড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেখানে নেই কোনো গেট, গেটম্যান কিংবা আধুনিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রেনচালক জানান, অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে তারা সব সময় আতঙ্কে থাকেন। অনেক সময় হর্ন বাজিয়েও দুর্ঘটনা এড়ানো যায় না। অসতর্কভাবে রেললাইন পারাপার কিংবা হঠাৎ যানবাহন বিকল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায় বড় দুর্ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে লাকসাম রেলওয়ে থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণপাড়া থেকে ফেনীর মুহুরীগঞ্জ পর্যন্ত, লাকসাম-নোয়াখালী ও লাকসাম-চাঁদপুর রুটে অসংখ্য অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। অসাবধানতার কারণেই দুর্ঘটনা বাড়ছে। জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
রেলওয়ের কুমিল্লা অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আনিসুজ্জামান বলেন, এলজিইডি সমন্বয় ছাড়াই অনেক সড়ক নির্মাণ করায় অবৈধ রেলক্রসিং তৈরি হয়েছে। বাধা দিলেও অনেক সময় তা উপেক্ষা করা হয়েছে। কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো পরিদর্শন করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
