ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কার্যকর

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির পূর্ব অংশে নৌ অবরোধ গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে কার্যকর করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নাবিকদের জন্য ইস্যু করা এক বিশেষ বার্তায় এ অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা দিয়ে বলেছে এটি সব ধরনের পতাকাবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

আরব সাগর ও ওমান সাগর থেকে এ অবরোধ কঠোরভাবে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়ে সেন্টকম বলেছে, ‘অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ যদি অবরোধ এলাকায় প্রবেশ করে বা ওই এলাকা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী জাহাজটিকে বাধা দেবে, গতিপথ পরিবর্তন করবে অথবা জব্দ করবে।’ 

সেন্টকমের বার্তা খতিয়ে দেখে বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই অবরোধের ফলে সাধারণ জাহাজ চলাচলে পুরোপুরি বিঘœ ঘটবে না। যেসব জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান বাদে অন্য কোনো দেশে যাতায়াত করবে, তাদের চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না। এ ছাড়া, খাদ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় মানবিক-সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলো চলাচলের অনুমতি পাবে।

নিরপেক্ষ জাহাজগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী যেকোনো সময় সেগুলো তল্লাশি করতে পারে। জাহাজে কোনো ধরনের নিষিদ্ধ পণ্য রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হতে এমন তল্লাশি করা হতে পারে। একইভাবে মানবিক সহায়তাবাহী জাহাজগুলোকেও নির্দিষ্ট তদারকি ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

সেন্টকমের এ নির্দেশিকা থেকে এটা স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাণিজ্য ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বন্ধ করতে এ অবরোধ শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক এই জলপথে যুুক্তরাষ্ট্রের এ অবরোধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে বিশ^বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ^বাজারে ক্রুড অয়েলের দাম গতকাল সোমবারই ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসি বলেছেন, আমেরিকার এ অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

পারসি আল জাজিরাকে বলেন, ‘বর্তমানে বাজার থেকে আরও তেল সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো পদক্ষেপ দাম বাড়িয়ে দেবে, যার ফলস্বরূপ গ্যাসের দাম আরও বাড়বে।’ পারসি বলেন, যদি এই অবরোধের কারণে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারের বেশি হতে পারে।

হুথিরা আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগকারী প্রণালি বাব আল-মানদেব বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে ইরান কার্যত প্রায় সব দেশের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে। ইরান বলছে, কেবল তাদের নিয়ন্ত্রণ মেনে এবং নির্দিষ্ট ফি নির্দিষ্ট মুদ্রায় দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ থামাতে ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনা চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নৌ অবরোধের ঘোষণা দেন।

ইরানকে টোল দিলে ব্যবস্থা : ইরানের জাহাজ এবং যারা ইরানকে হরমুজ প্রণালি হয়ে চলাচলের জন্য টোল দিচ্ছে, তাদের জাহাজও সমুদ্রে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ পাবে না।

আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা ডানা স্ট্রোল বলেন, ‘ট্রাম্প একটি দ্রুত সমাধান চান। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এককভাবে এই অবরোধ কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই না-ও হতে পারে।’    

ইরানের হুমকি : ইরানমুখী জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ কার্যকর করার জবাবে ইরান তাদের প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর পাল্টা হামলার কঠোর হুমকি দিয়েছে। ইরানের এক সামরিক মুখপাত্র বলেন, ইরানের বন্দরগুলো হুমকির মুখে পড়লে পারস্য উপসাগর বা ওমান উপসাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে না।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয় আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ চলাচালের ওপর আরোপ করা এ বিধিনিষেধ অবৈধ এবং জলদস্যুতার শামিল বলে দেশটি মনে করে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের উপায় খুঁজতে গত ৮ এপ্রিল থেকে ১৫ দিনের যে যুদ্ধ বিরতি চলছে, তা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

হিবরু গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে আলোচনা শেষে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফোনে ইরানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত আলোচনার বিষয়ে নেতানিয়াহুকে জানান। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়া এবং আগামী কয়েক বছর যাতে ইরানে কোনো ধরনের  ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ না হয়, তা নিশ্চিত করাই আলোচনার প্রধান বিষয়। এটি ইসরায়েলের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নৌ অবরোধ প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সার্বক্ষণিক সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছে।

তবে যুক্তরাজ্য বলে দিয়েছে, দেশটি এবারকার নৌ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হবে না।

ইসরায়েল প্রসঙ্গে এরদোয়ানের হুমকি : ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরায়েলের নির্মম হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ এরদোয়ান বলেছেন, প্রয়োজনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইস্তাম্বুলে ইন্টারন্যাশনাল এশিয়া-পলিটিক্যাল পার্টিজ কনফারেন্সে গত রবিবার এক ভাষণে তিনি এ হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলকে থামানোর জন্য আমাদের শক্তিশালী হতে হবে। আমরা যেভাবে কারাবাখ ও লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলাম, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারি। আমাদের ঠেকানোর মতো কেউ নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত