জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সক্ষমতা বাড়িয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার জেরে দায়িত্ব ছেড়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরীসহ চার কমিশনার। তারা বলেছেন, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমিশন (পুনর্গঠিত) এখন আর নেই। তাই তারা দায়িত্বে থাকতে চান না। পদত্যাগের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের উদ্দেশে তারা একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন, যেখানে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন বিদায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিস। গতকাল সোমবার এসব তথ্য জানা যায়।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ প্রতিস্থাপিত হলো বলে মন্তব্য করেছেন বিদায়ী কমিশনাররা। জানতে চাইলে কমিশনার পদে কিছুদিন দায়িত্ব পালনকারী নূর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে গেছে, তাই আমরা মনে করছি কমিশন আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। তাই আমাদের আর দায়িত্ব পালন করা সমীচীন হবে না মনে করে দায়িত্ব ছেড়েছি।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এক বছরের বেশি সময় অকার্যকর ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন পায়। এ অধ্যাদেশের আলোকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। এতে চেয়ারম্যান পদে হাইকোর্টের সাবেক বিচারক মইনুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি গুম কমিশনের প্রধান ছিলেন। এ ছাড়া নূর খান, নাবিলা ইদ্রিসও গুম কমিশনের সদস্য ছিলেন। অপর কমিশনার শরিফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক, ইলিরা দেওয়ান মানবাধিকারকর্মী। তবে, কমিশন গঠন হলেও মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে পুনর্গঠিত কমিশন।
প্রসঙ্গত, সবচে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের ছিল না। অধ্যাদেশে সেই ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়। তবে, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আগের অবস্থায় ফিরে যাবে কমিশন।
খোলাচিঠিতে যা আছে : “সদ্য বিদায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের খোলা চিঠি’ শীর্ষক চিঠির শুরুতে লেখা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন এখন আমাদের কী হবে?’ তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি।”
চিঠিতে ‘সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব’, ‘অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তিসমূহ’ এবং ‘ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা’ এমন তিনটি উপশিরোনামে তাদের অবস্থান এবং অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন বিদায়ী কমিশনাররা। এতে বলা হয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ হলো প্রিন্সিপাল আইন, এর ওপরই দাঁড়িয়ে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ।
চিঠিতে বলা হয়, সংসদে বলা হয় যে, গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর কারাদন্ড, যা ভুক্তভোগীদের জন্য অবিচার। অথচ গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদ-। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ পাস করে জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করলেও প্রকৃত অর্থে ভবিষ্যতে জুলাই যোদ্ধারা মামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
চিঠিতে বলা হয়, সরকারের অবস্থানের একটি মৌলিক অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে বলা হচ্ছে, যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী আইন প্রণীত হবে। অন্যদিকে বিশেষ সংসদীয় কমিটি কর্তৃক নথিভুক্ত সরকারের প্রকৃত আপত্তিগুলো মানলে, অনিবার্যভাবে পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের মতো দুর্বল আইন তৈরি হবে, যা জন্মলগ্ন থেকে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সংসদে বলা হয়েছে কমিশন তদন্ত করে আবার নিজেই বাদী হয়ে মামলা করা পক্ষপাতমূলক। এর যুক্তিতে বিদায়ী কমিশনাররা চিঠিতে বলেন কোনো অভিযোগ আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে প্রতীয়মান হলে, কমিশনের মামলা করার সুযোগ আছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব কেবল তখনই হতো, যদি কমিশন সেই মামলায় বিচারকের ভূমিকাও পালন করত, যা অধ্যাদেশে নেই।