২৫ বছরেও দুই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো না

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৯ এএম

আবারও এসেছে বাংলা বর্ষবরণের উৎসব। ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এ উৎসব দুই যুগের বেশি সময় ধরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি শোকের আবহ নিয়ে হাজির হচ্ছে। ২০০১ সালে বর্ষবরণের দিনে রমনা বটমূলে পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফেরণে ১০ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন অনেকে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার বিচার হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হতে লেগেছে দুই যুগ। আর বিচারিক আদালতে বিস্ফোরক মামলার বিচার এখনো চলছে। দুই মামলার কোনোটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি আজও।

২৫ বছর ধরে চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেই আছে মামলা দুটি। হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত সাতজন ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত তিনজনের সাজা কমিয়ে প্রায় এক বছর আগে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছিল তার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনো প্রকাশিত হয়নি। এ কারণে রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ আপিল করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

আইনজীবীদের তথ্য মতে, হাইকোর্টের রায়ে সাজা কমে ১০ বছর করে সাজাপ্রাপ্ত দুই আসামি কারামুক্তি পেয়েছেন। পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অন্য মামলা থাকায় তারা এখনো কারাগারে। বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনো চলছে ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতে। এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যায়ে রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আগামী বাংলা বর্ষবরণের আগেই এ মামলার বিচার শেষ হতে পারে।

হত্যাকা-ের ১৩ বছরের বেশি সময় পর ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান মুন্সী (অন্য মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে), মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা আকবর হোসেন, মুফতি আব্দুল হাই, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মুফতি শফিকুর রহমান ও আরিফ হোসেন ওরফে সুমন এই আট জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে প্রাণদ- কার্যকরের আদেশ দেয়।

রায়ের পর মৃত্যুদ-প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদ- অনুমোদনের নথি) যায় হাইকোর্টে। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে ২০১৫ সালের অক্টোবরে এ মামলার পেপারবুক (বিচারিক আদালতের রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত হয়। কারাগারে থাকা আসামিরাও আপিল করেন। হাইকোর্টে এ মামলার বিচার শেষ হতে লেগে যায় প্রায় এক দশক।

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হলেও বেঞ্চ পুনর্গঠনের কারণে শুনানি থমকে যায়। ওই বেঞ্চসহ হাইকোর্টের তিনটি দ্বৈত বেঞ্চে সাড়ে ৪০০ বারের বেশি শুনানির তারিখ ধার্য হলেও নিষ্পত্তি হতে লাগে প্রায় ১০ বছর। গত বছরের ১৩ মে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে তাজউদ্দিনের মৃত্যুদ-ের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় হাইকোর্ট। পাশাপাশি বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অপর ছয় জনের সাজা কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়। তাজউদ্দিন এখনো পলাতক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে আর আব্দুল হাই, জাহাঙ্গীর আলম বদর, সেলিম হাওলাদার এ তিনজনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।

হাইকোর্টে আকবর হোসেনসহ একাধিক আসামির পক্ষে শুনানিকারী জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান গত রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আকবরসহ ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত একাধিক ব্যক্তি ইতিমধ্যে সাজা খেটে মুক্তি পেয়েছেন। কেননা তারা ২০ বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন। তবে, পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো পাইনি।’ 

এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ছয় জন। তারা হলেন হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা সাব্বির ওরফে আবুল হাসান সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া ও শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল। হাইকোর্টের রায়ে শাহাদত উল্লাহ ওরফে জুয়েলের সাজা বহাল থাকে। আবু তাহের, সাব্বির ও শওকত ওসমানের সাজা কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়। বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আব্দুর রউফ ও ইয়াহিয়া মৃত্যুবরণ করায় তাদের আপিলের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করে হাইকোর্ট।

হাইকোর্টে হত্যা মামলার রায়ের পর যাদের সাজা কমেছে তাদের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করা হবে বলে জানিয়েছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আক্তার রুবী। গতকাল সোমবার তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল যে, পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে আপিল করব। কিন্তু রায়ের অনুলিপি এখনো পাইনি। যাদের ১০ বছরের সাজা হয়েছিল তাদের দু-একজন হয়তো কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন।’

হাইকোর্টে হত্যা মামলায় আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির গতকাল এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘হাইকোর্ট যে কয়েকজনকে ১০ বছর করে কারাদন্ড দিয়েছে তাদের দুজন ইতিমধ্যে মুক্তি পেয়েছে। পাঁচজন ভিন্ন মামলা থাকার কারণে এখনো জেলে আছেন।’ তিনি বলেন, ‘এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি বলে আপিল করা হয়নি। রায় প্রকাশিত হওয়ার পরে আসামিপক্ষ আপিল করলে শুনানি হবে।’ কোন দুজন কবে মুক্তি পেয়েছেন তা জানতে শিশির মনিরের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে এবং একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য জানা যায়নি। 

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের এই মামলা নিয়ে হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করলেও তা প্রকাশিত হয়নি। রায় প্রকাশিত হলে এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের অন্যতম কাজ। দ্রুত সময়ে আপিল নিষ্পত্তিতে আমরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করব।’  

২৫ বছর ধরে চলছে বিস্ফোরক মামলা : রমনা বটমূলে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে পৃথক একটি মামলা হয়। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ মামলাতেও ১৪ আসামিকে আসামি করা হয়। ইতিমধ্যে তিন আসামির মৃত্যু হওয়ায় এ মামলার আসামি এখন ১১ জন।

২০১৪ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মুফতি হান্নানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিস্ফোরক মামলার বিচার শুরুর আদেশ দেয়। ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত ৮৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি উপস্থাপনের কথা ছিল। ওই বছরের ৩ এপ্রিল আত্মপক্ষ সমর্থনের দিনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার আশা করেন সাত আসামি। অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। তবে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইনের বিধান অনুযায়ী ১৩৫ দিনে বিচার শেষ না হওয়ায় মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে ফেরত যায়। মহানগর দায়রা জজ মামলাটি ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারের জন্য পাঠান।

বিস্ফোরক মামলায় আসামিদের নিয়মিত হাজির না করায় মামলাটির বিচারকাজ আটকে আছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাহফুজ হাসান। আগামী ৯ জুলাই আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দিন ধার্য আছে। রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী বছরের বৈশাখ উদযাপনের আগেই এ মামলার বিচার নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানির দিনে একজন আসামি স্বাক্ষর না করে হাইকোর্টে আবেদন করেন। এতে বিচারকাজ আটকে যায়। তবে, বিচার চলতে হাইকোর্টের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। আগামী তারিখে আসামিদের আদালতে হাজির করা গেলে মামলাটি দ্রুত রায়ের দিকে যাবে।’

আসামিপক্ষের আইনজীবী জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের সদিচ্ছার অভাবে বিস্ফোরক মামলাটি থমকে আছে। দীর্ঘ দিন ধরে কেবল দিন ধার্য হচ্ছে।’ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জেল কর্তৃপক্ষ সবাইকে একসঙ্গে আদালতে হাজির করতে না পারায় বিচারকাজ শেষ করা যাচ্ছে না। আশা করছি, দ্রুত বিচারকাজ শেষ করতে পারব।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত