ট্রাম কার্ড মনজুর আলম!

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৬ এএম

ফের আলোচনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। বাংলা নববর্ষের দিন তার বাসায় এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ এমপির উপস্থিতি কেন্দ্র করে বন্দর নগরীর রাজনীতি অনেকটা সরগরম। তবে কি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেনকে ঠেকাতে তিনি ট্রাম কার্ড হতে যাচ্ছেনএমন আলোচনাই চলছে বিভিন্ন মহলে।

ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র এবং পরে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হওয়া এম মনজুর আলমকে চট্টগ্রাম মহানগরীর ভোটের রাজনীতিতে সবসময় একটা ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক সময় বিএনপি আর আওয়ামী লীগ উভয় দলের কাছেই তিনি ছিলেন সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির চোখ পড়েছে মনজুর আলমের দিকে।

গত মঙ্গলবার এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রাম এসে নগরীর কাট্টলীস্থ সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। এ খবর পেয়ে সাবেক মেয়রের বাসভবনের বাইরে অবস্থান নেন বেশ কিছু লোকজন। মনজুর আলমের বাসা থেকে বের হওয়ার পর সেখানে তোপের মুখে পড়েন হাসনাত। তারা মনজুর আলমের সঙ্গে সাক্ষাতের কৈফিয়ত চান হাসনাত আবদুল্লাহর কাছে। এ সময় সাবেক মেয়রকে আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যায়িত করে সেøাগান দেয় তারা। পরে পুলিশ এসে লোকজনকে সরিয়ে দিলে হাসনাত গাড়ি নিয়ে চলে যান।

সাবেক মেয়রের বাসার বাইরে এনসিপি নেতা হাসনাতকে ঘিরে বিক্ষোভের একাধিক ভিডিও যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। অনেকটা গোপনে মনজুর আলমের সঙ্গে হাসনাত আবদুল্লাহর সাক্ষাৎ বন্দর নগরীর আগামী দিনের রাজনীতি কিংবা আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নতুন কোনো মেরূকরণের পূর্বাভাস কি নাএ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা। তবে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে মনজুর আলম বলেছেন, মেয়র নির্বাচনের বিষয় নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। চট্টগ্রামে হাসনাত সাহেবের একটি প্রোগ্রাম ছিল। তিনি চট্টগ্রাম এসে ফোন দিয়ে বলেছিলেন আমার বাসায় আসবেন। আমি তাকে দুপুরের খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাই। তিনি বাসায় আসেন এবং দুপুরের খাবার খান। ২০১৫ সালের মেয়র নির্বাচনের পর রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন জানিয়ে মনজুর বলেন, এখন তিনি সমাজসেবামূলক কাজে জড়িত।

সাবেক মেয়রের সঙ্গে এনসিপি নেতার একই সাক্ষাতের বিষয়ে দলের চট্টগ্রাম মহানগর মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয় এটাকে সৌজন্য সাক্ষাৎ উল্লেখ করে বলেছেন, হাসনাত আবদুল্লাহ মূলত ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রাম এসেছিলেন। এ সময় সাবেক মেয়র মনজুর আলমের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। এ সময় তারা চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। বৈঠকে তারা আগামী দিনে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে, হাসনাত আবদুল্লাহর একটি সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক আবু বাকের মজুমদার লিখেছেন ‘মূলত সাবেক মেয়র মনজুর এনসিপির সমর্থনে চসিক থেকে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। বিএনপি যেখানে অন্তর্কোন্দলে, সেখানে এনসিপির শক্তিশালী ক্যান্ডিডেট ভয়ের কারণ হবে এটাই স্বাভাবিক।’

সাবেক মেয়র মনজুর আলমের সঙ্গে এনসিপি নেতা হাসনাতের এই সাক্ষাৎকে পক্ষান্তরে ফ্যাসিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা বলে আখ্যায়িত করেছেন বর্তমান মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, মনজুর আলম আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আশীর্বাদে ২০১০ সালে মেয়র হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে আমাদের দল যখন ক্ষমতায় আসতে পারেনি তখন ২০১৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগে চলে যান এবং তিনি আওয়ামী লীগকে বিভিন্নভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিলেন। এখন দেখছি হাসনাত আবদুল্লাহ মনজুর আলমের বাসায় গিয়ে বৈঠক করছেন। ইতিপূর্বে এনসিপির এক ইফতার পার্টিতে মনজুর আলমের প্যাকেট দেখেছিলাম, মিনারেল ওয়াটারের যে বোতলগুলো সেখানেও উনার নাম দেখেছিলাম। কাজেই বুঝতে বাকি থাকছে না, এনসিপি একদিকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কিংবা জুলাই আগস্টের পক্ষে কথা বলছে। কিন্তু পক্ষান্তরে তারা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চিন্তা ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবেই হাসনাতকে  মনজুর বাসায় দেখছি। হাসনাত আবদুল্লাহরা জুলাই যোদ্ধা হিসেবে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম করেছিল, আমরা দেখতে পাচ্ছি আল্টিমেটলি তারাই এখন পক্ষান্তরে ওই ফ্যাসিবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ড থেকে তিন দফা কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এম মনজুর আলম। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী ঘরানার কাউন্সিলর হিসেবে পরিচিত। ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থন নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং আওয়ামী লীগের এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারও বিএনপি প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রার্থী হন মনজুর। ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন এবং রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত