২০২২ সালের সেই শীতের রাত। মরুর বুকে স্থাপিত লুসাইল স্টেডিয়ামে লিওনেল মেসি এমন এক স্বপ্নকে ছুঁয়েছিলেন, যা তিনি আজন্ম লালন করেছেন। বছরের পর বছর তীব্র চাপ, হৃদয়বিদারক হার আর না পাওয়ার বেদনাকে সঙ্গী করে অবশেষে ফুটবল ইতিহাসের মহানায়ক হাতে তুলে নিয়েছিলেন অধরা বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার অধিনায়কের সেই মহাকাব্যিক জয়যাত্রার গল্প নিয়ে এই প্রতিবেদন সাজিয়েছে গোল ডট কম।
কাতার বিশ্বকাপের দিনগুলোতে দোহার কেন্দ্রস্থল সৌদ ওয়াকিফ যেন হয়ে উঠেছিল আকাশী-নীল সমুদ্র। দিনের বেলা বিশ্বের নানা প্রান্তের সমর্থকদের পদচারণায় মুখর থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে কেবল শোনা যেত একটিই সুর—‘মুচাচোস’। ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসিকে নিয়ে লেখা সেই গানটি কাতারজুড়ে এক উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল। মাঠে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের ঢল ছিল মেসির প্রতি এক অভূতপূর্ব সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।
দর্শকদের গানের কলিতে ছিল এক অদম্য আকুতি- ‘বন্ধুরা, আমরা আবার রোমাঞ্চিত। আমি তৃতীয় শিরোপাটি জিততে চাই, আমি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে চাই! স্বর্গে থাকা দিয়াগোকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, তিনি তাঁর বাবা-মায়ের সাথে লিওনেলকে উৎসাহ দিচ্ছেন।’
আর্জেন্টিনার এই যাত্রা মোটেও নিখুঁত ছিল না। টুর্নামেন্টের তৃতীয় দিনেই সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলের হার পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকা এক দলের এমন শোচনীয় পতন বিদায়ের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল শুরুতেই। ম্যাচ শেষে হতাশ কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, ‘ঘুরে দাঁড়ানো এবং সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। আজকের দিনটি অত্যন্ত বিষাদময়, কিন্তু আমাদের মাথা উঁচু রাখতে হবে এবং লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। ম্যাচের আগে সবাই আমাদের ফেভারিট বলছিল, কিন্তু বিশ্বকাপে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে।’
অধিনায়ক মেসিও বুঝতে পেরেছিলেন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তার দলের। তিনি সতীর্থদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়। আমরা এমন কিছুর (হারের) প্রত্যাশা করিনি, কিন্তু এখন সবকিছু আমাদের ওপরই নির্ভর করছে।’
পরের ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে যখন ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন ৬৪ মিনিটে সেই অতিমানবীয় গোল করে দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তোলেন মেসি। ম্যাচ শেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের কাঁধ থেকে এক বিশাল বোঝা নেমে গেছে। এখন আমরা মানসিকভাবে শান্ত এবং সবকিছু আবারও আমাদের নিজেদের হাতে ফিরে এসেছে।’
কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় লড়াই হিসেবে লেখা থাকবে। ১২০ মিনিটের লড়াই, ডাগ-আউটে হাতাহাতি আর পেনাল্টি শ্যুটআউটের সেই উত্তেজনা ছাপিয়ে আলোচনায় ছিল মেসির মেজাজ হারানোর মতো বিরল ঘটনা। ম্যাচ শেষে ডাচ কোচ লুই ফন গালের সমালোচনার জবাবে মেসি সরাসরি বলেছিলেন, ‘খেলার আগে ফন গাল আমাকে অসম্মান করেছেন। কিছু ডাচ খেলোয়াড় ম্যাচের সময় অনেক বেশি কথা বলেছে। আমি শুনেছিলাম ফন গাল বলছেন যে ,পেনাল্টিতে তাদের সুবিধা বেশি। ম্যাচ পেনাল্টিতে গেলে নাকি তারাই জিতবে। আমার মনে হয় তার মুখ বন্ধ রাখা উচিত ছিল।’
সেই ম্যাচেই ডাচ খেলোয়াড় ওউট ওয়েঘর্স্টের দিকে তাকিয়ে মেসির সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘কুয়ে মিরাস, বোবো?’ (কী দেখছিস রে বোকা?) বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়। সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর মঞ্চ প্রস্তুত হয় মেসির চূড়ান্ত ভাগ্যের। লুসাইলের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে যা ঘটেছিল, সেটাকে অনেকে ফুটবল ইতিহাসের সেরা ম্যাচ বলে আখ্যা দেন। এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক আর মেসির জোড়া গোলের লড়াই শেষে ট্রফিটি যখন মেসির হাতে উঠল, লুসাইলের মতোই যেন গর্জে উঠলেন পুরো বিশ্বের আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা যা করে গিয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে, মেসি তা করে দেখালেন ৩৬ বছর পর। লুসাইলের সেই রাত কেবল আর্জেন্টিনার ছিল না, তা ছিল এক আজন্ম স্বপ্নের সার্থক রূপায়ন। বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে মেসি নিজের ক্যারিয়ারকে নয়, আসলে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন।
ইতিহাস গড়ে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে গানার্সরা
ফিফটির সেঞ্চুরি করে কোহলির আরও কাছে বাবর আজম
মিউনিখে ৭ গোলের রোমাঞ্চ: রিয়ালকে কাঁদিয়ে সেমিতে বায়ার্ন