আবাসন খাতে দরকার ‘টেকনিক্যাল গভর্নেন্স’

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম

আবাসন খাতের উন্নয়নে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং রেজিস্ট্রেশনে উচ্চ ব্যয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তাই সরকারের কাছে আবাসন খাতে ‘টেকনিক্যাল গভর্নেন্স’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে স্বল্প মেয়াদে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যের লাগাম টেনে ধরার কথাও বলেছেন তারা।

গত সোমবার বেসরকারি চ্যানেল এশিয়ান টেলিভিশনের ‘আবাসন খাতের প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক টেবিল টকে অংশ নিয়ে আলোচকরা এসব কথা বলেন। হাবিবুর রহমান পলাশের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন রূপায়ণ গ্রুপের উপদেষ্টা সাদাত সেলিম এবং রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি মোকাররম হোসেন খান।

অনুষ্ঠানে সাদাত সেলিম বলেন, বাংলাদেশের আবাসন খাতের উত্থান যদি আমরা দেখি, গত ৩০ থেকে ৪০ বছরে এটি মূলত বেসরকারি খাতের হাত ধরেই এসেছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে এই খাতের বিকাশ হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পিত নগরায়ন না হওয়ায় প্রাইভেট সেক্টরই এ ক্ষেত্রে অনেকটা দায়িত্ব নিয়ে এগিয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি। রড, সিমেন্ট, ইলেকট্রিক্যাল পণ্য সব কিছুর দাম বাড়ছে। জ্বালানির দাম, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের সংকট এসব এর পেছনে কারণ। এটি শুধু আবাসন খাত নয়, পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।

তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই খাত স্থবির ছিল। এখন নতুন সরকার এসেছে, মানুষের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব না। সরকার যদি ভ্যাট-ট্যাক্স সহনীয় পর্যায়ে আনে এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি দেয়, তাহলে এই খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

সাদাত সেলিম বলেন, কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিলে আবাসন খাতে বড় বিনিয়োগ আসতে পারে।

বাংলাদেশে জমির স্বল্পতা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে আমাদের ভার্টিক্যালি যেতে হবে। হাইরাইজ বিল্ডিংই ভবিষ্যৎ। ড্যাপের ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মত হওয়া দরকার। সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের মতো মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে আমরা ‘টেক ঢাকা আউট অব ঢাকা’ ধারণা নিয়ে কাজ করেছি। ঢাকার বাইরে টাউনশিপ, গেটেড কমিউনিটি তৈরি করা জরুরি। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা থাকলে মানুষ দূরে থেকেও শহরে কাজ করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, রাজউকের ভূমিকা নিয়েও আমি বলব তারা প্ল্যানিং ও রেগুলেটরি কাজ করুক, কিন্তু জমি ব্যবসা না করাই ভালো। পিপিপি মডেলে জমি ডেভেলপারদের দিলে কম দামে আবাসন তৈরি সম্ভব। গ্রিন সিটি, এনার্জি সেভিং, ইনসুলেশন, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ এসব এখন জরুরি। সরকার যদি ইনসেনটিভ দেয়, তাহলে ডেভেলপাররা এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবে।

আবাসন খাতে ‘টেকনিক্যাল গভর্নেন্স’ দরকার বলে মন্তব্য করেছেন রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি মোকাররম হোসেন খান। তিনি বলেন, ভবন নির্মাণে শুধু অনুমোদন দিলেই হবে না, নির্মাণের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এখানে রিহ্যাব একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রাখতে পারে।

মোকাররম হোসেন খান বলেন, নতুন সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় আবাসন খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন কাঠামোও স্পষ্ট করতে হবে। বিশেষ করে প্ল্যানিং অথরিটি, মনিটরিং এবং অকুপেন্সি পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব আবাসন এখন আর অপশনাল না, এটি অপরিহার্য। ক্রেতারাও এখন ভালো পরিবেশ, ওপেন স্পেস, গ্রিন এরিয়া চান। তাই পরিকল্পনায় এগুলো বাধ্যতামূলক করা উচিত। তিনি আরও বলেন, এনার্জি সেভিং এখন বড় ইস্যু। বাংলাদেশ যেহেতু এনার্জি ঘাটতির দেশ, তাই ইনসুলেশন, দক্ষ এয়ারকন্ডিশনিং, কম বিদ্যুৎ খরচ এসব বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সোলার নীতিতে পরিবর্তন দরকার ছোট প্লটে সোলার কার্যকর না হলে ডেভেলপারদের কাছ থেকে ফান্ড নিয়ে সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে (যেমন উপকূলীয় বা বিদ্যুৎবিহীন এলাকায়)।

নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কিছু যৌক্তিক কারণ আছে উল্লেখ করে মোকাররম হোসেন খান বলেন, এতে আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রশ্নও আছে। যুদ্ধের আগেই রডের দাম ২০-২৫% বেড়েছে। আবার অ্যাগ্রিগেট আমদানি বন্ধ হওয়া, কপারসহ অন্যান্য কাঁচামালের দাম বাড়তি; এসবও প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু সমস্যা হলো বাজার আগে থেকেই সেøা। গত ২৩ বছর ধরে ক্রেতা কম, ফলে ডেভেলপাররা চাপে আছে। আমাদের সেক্টরে স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন দরকার। পরিকল্পনা, মনিটরিং এবং বাস্তবায়ন সব কিছু সমন্বিত হতে হবে।

তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কমানো খুব জরুরি। উচ্চ রেজিস্ট্রেশন কস্টের কারণে সেকেন্ডারি মার্কেট গ্রো করছে না। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার মতো ক্রস-ফাইন্যান্সিং মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে, যেখানে বড় প্রজেক্ট থেকে লাভ নিয়ে মধ্যবিত্তদের জন্য কম দামে আবাসন তৈরি করা হয়।

ল্যান্ড প্রজেক্টের ক্ষেত্রে প্রকৃত ডেভেলপারদের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, অনেকেই নিয়ম না মেনে প্রজেক্ট করে, ফলে সমস্যা হয়। এনার্জি সেভিং, সোলার ব্যবস্থাপনা এসব ক্ষেত্রেও নীতিগত পরিবর্তন দরকার। ছোট প্লটে সোলার কার্যকর না হলে বিকল্পভাবে সরকারের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। সব মিলিয়ে, পরিকল্পিত উন্নয়ন, নীতিগত সহায়তা এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া আবাসন খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না।

শহরের নিরাপত্তা নিয়ে মোকাররম খান বলেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখন বড় বাস্তবতা। অনেক পুরনো ভবনের রেট্রোফিটিং প্রয়োজন কিন্তু এটি বাস্তবে এগোচ্ছে না। এ বিষয়ে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগ দরকার। ফায়ার সেফটি ইস্যুতে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বড় সতর্কবার্তা।।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত