এক যুগ আগে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী গার্মেন্ট ব্যবসায়ী এ বি সিদ্দিক অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। সেই ঘটনা দেশের গ-ি পেরিয়ে বাইরেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অপহরণের ৩৬ ঘণ্টা পর এ বি সিদ্দিককে উদ্ধার করা হলেও গত এক যুগেও অপহরণের কারণ বা মোটিভ বের করতে পারেনি তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল দুপুরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দাপাস্থ গার্মেন্ট থেকে নিজের লাল রঙের প্রাইভেট কারে (ঢাকা মেট্রো গ ১৫-৮৮০০) চড়ে রাজধানী ঢাকায় যাচ্ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক ও তার চালক রিপন। তাদের গাড়িটি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ভূইগড় দেলপাড়া ভূঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে আসার পর পেছন থেকে নীল রঙের একটি হাইয়েস গাড়ি মৃদু ধাক্কা দেয়। পরে তাকে আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে অপহরণ করা হয়। ওই অপহরণের ঘটনা গোটা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বেশ আলোচিত হয়েছিল। পরদিন নারায়ণগঞ্জে সড়ক অবরোধসহ সারা দেশে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। ৩৬ ঘণ্টা পরে তাকে মিরপুর কাজীপাড়া এলাকায় ছেড়ে দেয় অপহরণকারীরা।
জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সে সময়ে এ বি সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, ‘পাঁচ-ছয়জন অপহরণকারী তাকে জোর করে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়। পরে হাত, পা, চোখ বেঁধে একটি মাস্ক বা কাপড় পরিয়ে শুইয়ে দেয়। অপহরণকারীরা সবাই স্বাস্থ্যবান ছিল এবং তাদের সবারই বয়স ছিল ৩৫-এর মতো। এর মধ্যে একজন ছিল ভিন্ন ধরনের ভালো জামাকাপড় পরা। ওই যুবকটি আমাকে পিস্তল ধরেছিল। আমাকে গাড়িতে ওঠানোর পরে গাড়িটি কিছুক্ষণ চলার পরে একটি ফেরি পার হয়। আমাকে অন্য একটি গাড়িতে উঠিয়ে আবার চলতে শুরু করে। এরপর আরও একটি ফেরি পার হয়। সর্বমোট ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা গাড়ি চলার পর সন্ধ্যার দিকে একটি বাড়ির মেঝেতে আমাকে নিয়ে রাখা হয়। অপহরণকারীরা আমাকে কোনো ধরনের টর্চার করেনি কিংবা খারাপ আচরণ করেনি। ওই দিন রাতে তাদের ভাই বা গুরু পরিচয়ে একজন এসে আমার পরিচয় জানতে চান। ওই ব্যক্তিটি (গুরু) আমাকে বলেন, তুই তো মনে হয় অনেক টাকার মালিক। তখন আমি তাকে বলি টাকা লাগলে আমার বাড়ির নম্বর নেন। কিন্তু আর কিছু না বলে ওই ব্যক্তিটি চলে যায়। পরদিন রাতে ওই ব্যক্তিটি আবার এসে বলে, তুই তো অনেক বিখ্যাত লোক। তোকে মেরে ফেললেও লস। কারণ মেরে ফেললে টাকা পাব না। তার চেয়ে বরং তোকে ছেড়ে দিই।’ পরে ১৭ এপ্রিল রাত ১০টার দিকে এ বি সিদ্দিককে ওই বাড়ি থেকে বের করে এক থেকে দেড় ঘণ্টা গাড়িতে করে চলার পর আনসার ক্যাম্পের সামনে ৩০০ টাকা হাতে দিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় নামিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। সিদ্দিক বলেন, ‘চোখ বাঁধা থাকায় কাউকে চিনতে পারিনি। তবে তাদের ফিসফিস কথা শুনেছি। দুর্বৃত্তরা যখন আমাকে মিরপুরে নামিয়ে দেয় তখন আমার শার্ট ছেঁড়া ও পা খালি ছিল। পরে আমি রিকশা নিয়ে কাজীপাড়া হয়ে এরপর একটি সিএনজি নিয়ে ধানম-ি যাওয়ার সময়ে পুলিশের একটি চেকপোস্টে আমার সিএনজি থামানো হয়। আমি নিজের পরিচয় দেওয়ার পরে প্রথমে তারা বিশ্বাস করতে পারেনি। এরপর একজন কনস্টেবল আমাকে চিনতে পারে। পরে পুলিশের ভ্যানে করে প্রথমে আমাকে ধানম-ি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।’
জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পরে ১৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালতে এ বি সিদ্দিকের জবানবন্দি ১৮ পৃষ্ঠায় রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে ওই জবানবন্দি পর্যালোচনা করে আজও অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়নি। এ বি সিদ্দিক অপহরণের ১১ দিন পরেই নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনা ঘটে। এরপর মামলাটির ওই সময়কার তদন্তকারী কর্মকর্তা বদলি হয়ে যায়। পুলিশ প্রশাসনেও ব্যাপক রদবদল হয়। যার কারণে মামলাটির তদন্তকাজ বেশি দূর এগোয়নি। গেল এক যুগেও জানা যায়নি কেন, কী কারণে অপহরণ করা হয়েছিল এ বি সিদ্দিককে।