সিডিএ শহরের ভেতরে হাসপাতাল চায় না

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১২ এএম

চট্টগ্রামের ফুসফুসখ্যাত সিআরবিতে ইউনাইটেড গ্রুপের হাসপাতাল নিয়ে উত্তপ্ত চট্টগ্রামের পরিবেশ। শতবর্ষী বৃক্ষ সাবাড় করে এবং এখানকার ইকোসিস্টেম ধ্বংস করে নগরের পরিবেশ নষ্ট করে কেউ হাসপাতাল চায় না। এই নগরে আরও অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে হাসপাতাল করা যায়। নগরীর প্রান্তীয় এলাকায় হাসপাতাল গড়ে তোলা হলে সেসব এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানেও নগরের প্রান্তীয় এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

নগরের কোথায় কোন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়ার কথা সিডিএর। আর এ লক্ষেই সিডিএ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছে। আগের মাস্টারপ্ল্যান ও ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানেও সুপারিশ ছিল হাসপাতাল নির্মাণে। কিন্তু বর্তমানে কোন কোন এলাকায় হাসপাতাল ও ক্লিনিক নির্মাণের জন্য উপযোগী এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে? এ সব বিষয়ে জানতে কথা হয় মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারীর সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের সার্ভে রিপোর্টের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, নগরের কেন্দ্রে অনেকগুলো হাসপাতাল ও ক্লিনিক বিদ্যমান রয়েছে। আর তাই জিইসি, মেহেদিবাগ, পাঁচলাইশ, চকবাজার এলাকাটিতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অনেক প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। একইসঙ্গে জাকির হোসেন রোডে ইউএসটিসি, ইম্পেরিয়াল, ডায়াবেটিস হাসপাতাল রয়েছে, আন্দরকিল্লা এলাকায় জেনারেল হাসপাতাল রয়েছে। তাই এসব এলাকায় নতুন কোনো হাসপাতাল নির্মাণকে আমরা নিষিদ্ধ করেছি।

হাসপাতাল কোথায় হবে : এই এলাকাগুলো ছাড়া হাসপাতাল কোথায় হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে আবু ঈসা আনসারী বলেন, নগরীর পতেঙ্গা, হালিশহর, দক্ষিণ কাট্টলী, বায়েজিদ, অক্সিজেন ও কালুরঘাট এলাকায় তেমন কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই। তাই নতুন হাসপাতাল বা ক্লিনিক নির্মাণে এই এলাকাগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে মাস্টারপ্ল্যানে। একইসঙ্গে গাইডলাইনও দেওয়া হয়েছে।

সিডিএর এই রিপোর্টকে সমর্থন করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রে সরকারি ও প্রাইভেট মিলিয়ে অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে নগরীর প্রান্তীয় এলাকা পতেঙ্গা, হালিশহর, বায়েজিদ কিংবা অক্সিজেন এলাকাগুলো প্রাধান্য পেতে পারে। ইতিমধ্যে পতেঙ্গায় একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্দেশনাও দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম শহর ও জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবচেয়ে বেশি রোগী আসে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সবচেয়ে বৃহৎ হাসপাতালও এটি। নতুন হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে এই হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মোসলিম উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি রেফারেল হাসপাতাল। ঢাকা শহরে যেখানে এমন ৫টি হাসপাতাল রয়েছে চট্টগ্রামে সেখানে মাত্র একটি। তাই আমরা এই হাসপাতালের দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন করতে যাচ্ছি। তবে নগরের প্রান্তীয় মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পতেঙ্গা, হালিশহর, বায়েজিদ, হাটহাজারিসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে হাসপাতাল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে সেসব এলাকার হাসপাতাল থেকে রেফারেল রোগী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসার সুযোগ থাকবে এবং নগরবাসীও স্বাস্থ্যসেবা পাবে।’

পতেঙ্গা ও কালুরঘাটে হবে পৃথক হাসপাতাল : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, অবশ্যই নগরীর কেন্দ্রে এখন আর নতুন হাসপাতালের দরকার নেই। নগরের প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমরা বাকলিয়া কল্পলোকে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে যাচ্ছি। এ ছাড়া একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মিত হবে কালুরঘাট শিল্প এলাকায় সিটি করপোরেশনের জায়গায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হাসপাতালটি নির্মাণের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মহোদয় পতেঙ্গায় একটি হাসপাতাল নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন।

পরিকল্পনাবিদের বক্তব্য : চট্টগ্রাম শহরের পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করা পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে অন্যতম স্থপতি জেরিনা হোসেন। তিনি বলেন, নগরের ভেতরে কেন হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে? প্রান্তীয় এলাকায় অনেক জায়গা পড়ে রয়েছে সেসব এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ করলে সেখানকার অধিবাসীরা যেমন সেবা পাবে তেমনিভাবে ট্রাফিকও ডাইভার্ট হবে। নগরের ওপরে চাপ কমবে। এই শহরের পতেঙ্গা, হালিশহর, পাহাড়তলী প্রভৃতি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ না করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রেলওয়ের আরও অনেক জায়গা রয়েছে। সেসব জায়গায় প্রয়োজনে পিপিপির অধীনে হাসপাতাল নির্মাণ করতে পারে। উল্লেখ্য, নগরীর সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের প্রতিবাদে ২০২০ ও ২০২১ সালে ৪৮০ দিন টানা আন্দোলন করেছিল চট্টগ্রামবাসী। সেই আন্দোলনের ফলে তখনকার সময়ের সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ বাতিল করেছিল। এর প্রতিবাদে সিআরবি রক্ষা পরিষদ গতকাল রবিবার সকালে সিআরবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং এখানে হাসপাতাল নির্মাণ প্রক্রিয়া যেকোনোভাবে প্রতিহতের ঘোষণা দেয়। এদিকে এই স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শনের জন্য গতকাল বিকেলে ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা ছিল রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের। কিন্তু তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যাননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত