মিরপুরের সবুজ ঘাস, পরিচিত ড্রেসিংরুম আর গ্যালারির সেই চিৎকার সবই এক আছে। নেই শুধু সেই রান-আপ, সেই স্লিঙ্গিং অ্যাকশন আর উইকেট পাওয়ার পর শিকলভাঙা বাঘের মতো সেই বুনো উল্লাস। সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে যখন রুবেল হোসেন মাঠে ঢুকলেন, হাতে বল ছিল না; ছিল সাত বছরের ছেলে আয়ানের হাত। বল হাতে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে নয়, এবার তিনি এসেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে চিরতরে ‘বিদায়’ বলতে।
মাঠে তখন বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় ওয়ানডে শুরুর আবহ। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের হাত থেকে বিদায়ী ক্রেস্ট আর তিন ফরম্যাটের জার্সিতে খোদাই করা নিজের পরিসংখ্যান বুঝে নিলেন রুবেল। সতীর্থরা দুই পাশে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ‘গার্ড অব অনার’ দিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি এলো একটু পরে।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রুবেল ছোট ছেলে আয়ানকে নিয়ে গেলেন পিচের একদম কাছে। যে উইকেটে তিনি একসময় গতির ঝড় তুলতেন, সেখানে হাঁটু গেড়ে বসলেন। পরম মমতায় হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলেন উইকেটটা। দৃশ্যটা মনে করিয়ে দিচ্ছিল ২০১৪ সালে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে শচীন টেন্ডুলকারের বিদায়ের দিনটিকে। শচীনও এভাবেই তার প্রিয় ২২ গজকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন। রুবেলের চোখে তখন স্মৃতির মিছিল।
সংক্ষিপ্ত বিদায়ী অনুষ্ঠানে রুবেলের একসময়ের সতীর্থ তাসকিন আহমেদ ফিরে গেলেন ২০১৫ সালের সেই জাদুকরি রাতে। অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রুবেলের সেই জোড়া আঘাত! তাসকিন বলছিলেন, ‘মনে পড়ে ২০১৫ বিশ্বকাপের সেই ইংল্যান্ড ম্যাচটা? রুবেল হোসেনই আমাদের জিতিয়েছিল। আপনি আমাদের নায়ক।’ জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রডকে বোল্ড করে পুরো বাংলাদেশকে আনন্দে ভাসানোর সেই ছবিটা আজও দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফ্রেম।
রুবেল বরাবরই ছিলেন মুখচোরা, লাজুক। ড্রেসিংরুমে বা সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে আড়াল করে রাখতেই পছন্দ করতেন তিনি। সোমবারও যখন প্রেসবক্সে এলেন, সাংবাদিকদের হাসিমুখে বললেন, ‘আমি তো কথা ভালো বলতে পারি না। কী বলতে আবার কী বলে ফেলি...!’ আশ্চর্যের বিষয় হলো, রুবেল যতটা আড়ালে থাকতে চেয়েছেন, নিয়তিও যেন তাকে সেদিকেই ঠেলেছে। দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে সবসময় লড়াই করতে হয়েছে তাকে। কখনো মাশরাফি বিন মুর্তজা, কখনো মোস্তাফিজ বা তাসকিনদের ভিড়ে টিম কম্বিনেশনের কারণে ডাগআউটে বসে থাকতে হয়েছে ফর্ম তুঙ্গে থাকা অবস্থায়ও। কিন্তু যখনই মাঠে নামতেন, অধিনায়কের বড় ভরসা হয়ে উঠতেন তিনি। উইকেট না পড়লে রুবেলকে আনা হতো ‘ব্রেক-থ্রু’র জন্য। সেই রুবেল আজ থেকে শুধুই সাবেক।
রুবেলের বিদায় বেলা মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই হ্যাটট্রিকের কথা। ২৬ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন সেদিন, যা আজও ওয়ানডেতে বাংলাদেশের যৌথভাবে সেরা বোলিং ফিগার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল ২০০৯ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে ৪ উইকেট দিয়ে। মাঝে অনেক চড়াই-উতরাই এসেছে, কিন্তু গতির সঙ্গে আপস করেননি রুবেল।
২০২১ সালের এপ্রিলে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অকল্যান্ডে শেষ টি-টোয়েন্টি খেলেছিলেন। এরপর দীর্ঘ বিরতি। গত কয়েক বছর ধরে তাকে মানুষ চিনত মোটরসাইকেল ব্যবসায়ী হিসেবে। কিন্তু রুবেল হোসেনের আসল পরিচয় ছিল সেই তেড়েফুঁড়ে আসা পেস বোলার।
ছেলের হাত ধরে শের-ই-বাংলার ড্রেসিংরুমের চেনা দরজাটা পেরিয়ে যখন মাঠে ঢুকছিলেন রুবেল হোসেন, গ্যালারি থেকে তখন দু-একজন দর্শক চিৎকার করে বলে উঠলেন ‘রুবেল ভাই, রুবেল ভাই...’।