এআইয়ের যুগে: ক্রিয়েটিভিটি কি হারিয়ে যাচ্ছে, নাকি নতুন করে জন্ম নিচ্ছে?

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

২১ এপ্রিল বিশ্ব সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন দিবস। ঠিক এমন এক সময়ে আমরা এই দিনটি পালন করছি, যখন এআই আমাদের কাজের ধরন, চিন্তার ধরন, এমনকি সৃষ্টির পদ্ধতিকেও দ্রæত বদলে দিচ্ছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন সামনে আসে—এই পরিবর্তনের ভেতরে কি মানুষের ক্রিয়েটিভিটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি এটি নতুন এক রূপে আবার ফিরে আসছে?

আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আগে একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ক্রিয়েটিভিটি কোনো যন্ত্র বা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল কিছু নয়। এটি মানুষের ভেতরের একটি মৌলিক ক্ষমতা—যা যুগে যুগে বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। প্রযুক্তি বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের সৃজনশীলতা কখনো থেমে থাকেনি। বরং প্রতিবারই নতুন প্রেক্ষাপটে এটি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে।

একসময় সৃজনশীলতা মানেই ছিল—নিজের হাতে তৈরি করা। একটি গল্প লেখা, একটি ছবি আঁকা, একটি আইডিয়া বের করা—সবকিছুই ছিল মানুষের ব্যক্তিগত শ্রম ও চিন্তার ফল। এখন সেই জায়গায় এআই এসে অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডেই একটি লেখা, একটি ডিজাইন, এমনকি একটি আইডিয়ার খসড়াও তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—তাহলে মানুষের ভ‚মিকা কি কমে যাচ্ছে?

আসলে বিষয়টা এতটা সরল না। এআই তৈরি করতে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না। এটি আগে থেকে সেট করে দেওয়া ডেটা থেকে শিখে, প্যাটার্ন তৈরি করে—কিন্তু মানুষের মতো করে জীবনকে অনুভব করার ক্ষমতা তার নেই। একজন মানুষ তার জীবনের অভিজ্ঞতা—ব্যর্থতা, সংগ্রাম, ভালোবাসা, ভয়—এসবের ভেতর দিয়ে যে ভাবনা তৈরি করে, সেটাই তার সৃজনশীলতার আসল উৎস। এই জায়গাটাই এখনো পুরোপুরি মানুষের।

এই কারণেই ক্রিয়েটিভিটির সংজ্ঞা একটু বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু কিছু তৈরি করাই বড় কথা নয়—বরং কেন তৈরি করা হচ্ছে, সেটি কতটা অর্থপূর্ণ, এবং মানুষের মনে কতটা প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি সাধারণ লেখা হয়তো এআই সহজেই তৈরি করতে পারে, কিন্তু এমন কিছু যা মানুষের ভেতরে অনুভ‚তি জাগায়, চিন্তা বদলায়—সেটা এখনো মানুষেরই কাজ।

আজকের পৃথিবীতে ক্রিয়েটিভিটির প্রয়োজনীয়তা বরং আগের চেয়ে বেশি। কারণ আমরা এখন তথ্যের অভাবে ভুগছি না—বরং অতিরিক্ত তথ্যের মধ্যে ডুবে আছি। এই ভিড়ের মধ্যে আলাদা হয়ে দাঁড়াতে হলে দরকার নতুনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা। আর এই জায়গাতেই সৃজনশীলতা সবচেয়ে বেশি দরকার।
শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। যদি ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে শুধু বইয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তাদের কল্পনাশক্তি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যায়। কিন্তু যদি তাদেরকে আঁকতে দেওয়া হয়, কাগজ কেটে কিছু বানাতে দেওয়া হয়, নিজের মতো গল্প বানাতে উৎসাহ দেওয়া হয়—তাহলে তারা চিন্তা করতে শেখে, নিজের মতো করে ভাবতে শেখে।

আর্ট ও ক্রাফটের মতো সহজ সৃজনশীল কাজগুলো এখানে বড় ভ‚মিকা রাখে। এগুলো শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম না—এগুলো শিশুদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তাদের নিজের ভেতরের কল্পনাকে প্রকাশ করার সুযোগ দেয়। একটি শিশু যখন নিজের হাতে কিছু তৈরি করে, তখন সে শুধু একটি জিনিস বানায় না—সে নিজের ভেতরের ভাবনাকে বাস্তব করে তোলে।

এআইয়ের এই যুগে এই ধরনের মানবিক গুণগুলোই সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠছে। কারণ নিয়মমাফিক, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো এআই খুব সহজেই করতে পারে। কিন্তু নতুনভাবে ভাবা, অনুভব করা, এবং সৃষ্টির মধ্যে অর্থ খুঁজে পাওয়া—এই জায়গাগুলো এখনো মানুষের হাতেই সবচেয়ে শক্তিশালী।
তাই এআইকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই—বরং এটিকে একটি টুল হিসেবে দেখা দরকার। যারা এই টুলকে ব্যবহার করতে পারবে, তারা আরও দ্রæত, আরও ভালো, এবং আরও গভীর কাজ করতে পারবে। তারা শুধু কাজ শেষ করবে না—কাজকে আরও অর্থবহ করে তুলবে।

এখানে পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, এবং সমাজেরও একটা বড় ভ‚মিকা আছে। শিশুদের প্রশ্ন করতে দিতে হবে, নতুন কিছু চেষ্টা করতে উৎসাহ দিতে হবে, আর ব্যর্থতাকে খারাপ কিছু না ভেবে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ সৃজনশীলতা চাপ দিয়ে তৈরি করা যায় না—এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত, এআই আমাদের জায়গা নিতে আসেনি। বরং এটি আমাদের সামনে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ এনে দিয়েছে—আমরা কি শুধুই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবো, নাকি আমাদের মানবিক গুণাবলিকে আরও শক্তিশালী করবো?

উত্তরটা আমাদের হাতেই। যদি আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা, আবেগ, আর কল্পনাশক্তিকে গুরুত্ব দিই, তাহলে ক্রিয়েটিভিটি কখনো হারাবে না। বরং এটি নতুনভাবে, আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে।

তাই বলা যায়—এআইয়ের যুগে ক্রিয়েটিভিটি হারিয়ে যাচ্ছে না, এটি নতুন করে জন্ম নিচ্ছে।
তাহমিনা রহমান , লেখক, ফাউন্ডার, কিডস টাইম

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত