ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতি বাংলাদেশ সময় আগামীকাল বৃহস্পতিবার ভোরে শেষ হচ্ছে। তার আগেই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিসইয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ শেষ করতে চায়। তবে চুক্তিসই করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে যে সংলাপে বসতে হবে, তা নিয়েই ঝামেলা হচ্ছে। বাংলাদেশ সময় গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টা পর্যন্ত দুই দেশের প্রতিনিধিদের আলোচনা শুরু হওয়া তো দূরের কথা, তারা আলোচনার স্থান ইসলামাবাদে পৌঁছাতেই পারেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রবর্তী দল আলোচনার স্থান ইসলামাবাদে পৌঁছেছে গত সোমবার। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যেকোনো সময় রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছেন। কিন্তু ইরান প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে, এটা নিশ্চিত না হওয়ায় তিনি রওনা হচ্ছেন না। আর ইরান চাপের মুখে আলোচনায় বসার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
এদিকে ইরান আলোচনায় বসবে, এমন ‘আত্মবিশ^াস’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন যে, তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ‘বুধবার সন্ধ্যার’ (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার ভোর) পর আর বাড়াতে চান না। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনবিসি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তা করতে চাই না। আমাদের হাতে অতটা সময় নেই।’
ট্রাম্প মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করা ছাড়া ইরানের আর কোনো বিকল্প নেই। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি না হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে ‘বোমাবর্ষণ শুরু করবে’ এমন ধমকও তিনি দিয়ে রেখেছেন। আমেরিকার গণমাধ্যম সিএনবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি বোমা হামলা চালানোর প্রত্যাশা করছি; কারণ আমি মনে করি এটাই উত্তম পন্থা।’
অন্যদিকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, দেশটি আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি ‘ইতিবাচকভাবে বিবেচনা’ করছে। তবে ইরান চাপের মুখে আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিপক্ষে। এ কারণে ইরান চায় তাদের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা হোক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বলছে, চুক্তিসই না হলে অবরোধ উঠবে না। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়া নিয়ে এখানেই বেধেছে ঝামেলা।
ইরান পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক্স পোস্টে বলেন, হুমকির মুখে ইরান কোনো আলোচনায় বসবে না। ট্রাম্পের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আলোচনার টেবিলকে ‘আত্মসমর্পণের টেবিল’ বানাতে চাইছেন অথবা নতুন করে যুদ্ধ বাধানোর অজুহাত খুঁজছেন।
যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরানও নতুন খেলা দেখানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, এমনটি জানান বাঘের গালিবাফ।
দেশ দুটি থেকে যা জানা যাচ্ছে, সে অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত উভয়পক্ষ আলোচনায় বসলে ভ্যান্স ও গালিবাফ নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালালে যুদ্ধ শুরু হয়। গতকাল ছিল যুদ্ধের ৫৩তম দিন।
আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান চাওয়া ইরান নিজের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ত্যাগ করবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এমন প্রতিশ্রুতি দেবে। আর ইরান চায় পারমাণবিক সক্ষমতা ও হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে।
দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার দ্বিতীয় দফায় অংশগ্রহণের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানার জন্য ‘অপেক্ষা করা হচ্ছে’। গত ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে প্রথম দফার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ‘যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর’ বিষয়টি বিবেচনা করতে এবং সমস্যা সমাধানে যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গতকাল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ন্যাটালি বেকারের সঙ্গে এক বৈঠকে এ মত ব্যক্ত করেন।
ন্যাটালি বেকার আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং সংলাপ সহজতর করতে পাকিস্তানের গঠনমূলক ও ইতিবাচক ভূমিকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধে বিবদমান দেশগুলো শেষ পর্যন্ত একমত হতে না হতে পারলে ‘থেমে-থেমে-চলে’ এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট’ হিসেবে পরিচিত। এতে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির জটিলতা কাটার তেমন সম্ভাবনা সহসা নাও দেখা দিতে পারে।
