এবারও কৃষকের মাথায় হাত

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম

হাওরাঞ্চলের  সাত জেলায় শুরু হয়েছে ধান কাটার উৎসব। তবে কষ্টের এই ফসল ঘরে তুলতে কৃষকের মনে যে আনন্দ তা নিমেষেই মলিন হয়ে যাচ্ছে বাজারে গিয়ে। কারণ কৃষকরা ধানের ভালো দাম পাচ্ছেন না। উৎপাদন খরচের চেয়েও কমে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ গত কয়েক মৌসুম ধরেই সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার কিনে, জ¦ালানি তেলের সংকটের মধ্যেও বাড়তি খরচে সেচ ঠিক রেখে, ধার করে টাকা নিয়ে দেশের উৎপাদন পরিস্থিতি ঠিক রাখতে কাজ করছেন সারা দেশের কৃষকরা।

নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ কয়েকটি জেলায় পুরোদমে ধান কাটা চলছে। এসব অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকাভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। তবে এই ধানটা পুরোপুরি শুকনো নয়। একটু শুকিয়ে যেসব কৃষক বিক্রি করছেন তারা মণপ্রতি ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন। অথচ কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে এক কেজি ধানের উৎপাদন খরচ হিসাব করেছিল ৩২ দশমিক ৯৬ টাকা। যাতে এক মণ (৪০ কেজি হিসেবে) ধানের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৩১৮ টাকা। এবারও তারা খাদ্য মন্ত্রণালয়কে ধানের উৎপাদন খরচের একই রকম হিসাব দিয়েছে। যদিও সার ও সেচে কৃষককে এ মৌসুমে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে।

দেশ রূপান্তরের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জাকারিয়া আহমেদ হাওর অঞ্চলের কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাহিরপুর উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের কৃষক মোবারক মিয়া তাকে জানান, তিনি ১২ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করেছেন। ঋণ থাকায় কাটার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ॥ধান বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। তিনি প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ৯৫০ টাকায়।

এই কৃষক বলেন, ‘সারের দাম বেশি, সেচের দাম গতবারের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু আমি যে দামে বিক্রি করছি তাতে করে উৎপাদন খরচও উঠছে না। ব্যাপারীরা যেভাবে মাঠ থেকে ধান কিনছেন সেভাবে সরকার যদি ধান কিনত তাহলে আমি হয়তো ভালো দাম পেতাম। কিন্তু ঋণ থাকায় এই ধান আমাকে কাটার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, সেখানকার হাওরে ধান কাটা পুরোদমে শুরু হয়েছে। জমি থেকেই যারা ফসল বিক্রি করছেন তারা ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা মণ হিসেবে দাম পাচ্ছেন। কিন্তু যারা একটু প্রত্যন্ত গ্রামে রয়েছেন তারা দামটা আরও কম পাচ্ছেন।  একই চিত্র দেখা গেছে কিশোরগঞ্জসহ অন্যান্য অঞ্চলেও। কৃষকরা বলছেন, ক্ষেত থেকে যত বেশি ধান উঠতে থাকবে দামও তত কমতে থাকবে।

হাওর অঞ্চলে ইতিমধ্যেই ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাটা হয়েছে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জের হাওরে। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জেও ১৫ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল থেকেই এসব জায়গায় ধান কাটা শুরু হয়েছে।

কৃষকের যখন এই পরিস্থিতি, তখন আজ সকালে আধা ডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলে বৈঠকে বসবেন। সঙ্গে থাকবেন মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব, বিভিন্ন সংস্থার প্রধান ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি’র (এফপিএমসি) এই সভায় নির্ধারণ হবে এবারের বোরো মৌসুম থেকে কতটুকু ধান ও চাল কিনবে সরকার। একই সঙ্গে ঘোষণা আসবে সরকার কত টাকায় ধান ও চাল কিনবে। তবে এটা শুধুমাত্র সীমিত  কেনাকাটার পরিকল্পনা। সেখানেও প্রকৃত কৃষকরা সুবিধাভোগী হন কি না তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকার সাড়ে ৩ লাখ টন ধান ও ১৪ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল কিনেছিল। যেখানে প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৬ টাকা এবং সেদ্ধ চালের দাম নির্ধারণ করা হয় ৪৯ টাকা। এবারে ধান ও চাল কেনার পরিমাণে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে দাম থাকতে পারে গত বছরের মতোই।

জানা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের এক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এবারে ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল কিনতে চায় তারা। আগামী ১৫ মে থেকে ৩১ আগস্ট সময়ের মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তর ধান সংগ্রহ করার চিন্তা করছে। কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, এই সময়ের মধ্যে হাওরের ধান কাটা পুরোপুরি শেষ হতে পারে। একই সঙ্গে সারা দেশের ধানের একটা বড় অংশ কাটা এবং বিক্রির কাজ শেষ হয়ে যাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ধান ও চাল কেনে দুটি কারণে। একটি সরকারের প্রয়োজনীয় মজুদ তৈরি এবং অন্যটি হচ্ছে কৃষক যাতে দাম পায়। কিন্তু এই কেনাকাটার সময়ের নির্ধারণের পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে প্রতি বছরই কৃষকরা ঠকে যান। ফলে সরকারের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য বেশিরভাগ সময়ই সফল হয় না। একদিকে বাজারে কৃষকরা ঠকছেন, অন্যদিকে কঠিন শর্তের বেড়াজালে কৃষকরা সরকারের কাছে ধান বিক্রিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতেও সরকারিভাবে খাদ্যশস্য যেমন ধান ও গম কেনা হয়। এই শস্যগুলোর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করা হয় ফসল কাটার আগেই। যেখানে ফসল তোলার আগেই বাজারে মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে কৃষকের দরকষাকষির একটা সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। প্রতি বছরই বড় একটা অংশ ধান কাটার পর গিয়ে সরকার কেনাকাটার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার আরও ১৫ থেকে ২০ দিন পর গিয়ে সরকার কেনাকাটা পুরোদমে শুরু করে। এই সময়ের মধ্যেই লাখ লাখ কৃষক বাজারে ধানের দাম হারায় এবং উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আবার এই দামটা যখন বাড়তে শুরু করে তখন বেশিরভাগ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে আর বিক্রির উপযোগী ধান থাকে না। কারণ সাধারণ কৃষক দ্রুত ধান বিক্রি করে দেন। তবে এই পরিস্থিতি বছরের পর বছর চললেও সরকারের সেভাবে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। বারবারই কৃষকরা দেশকে ভালো ফলন দিলেও নিজেরা মূল্য পান না।

এ কারণে ইতিমধ্যেই রেকর্ড সংখ্যক কৃষক ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং ক্যাশ ক্রপ হিসেবে পরিচিত ভুট্টা ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। অথচ এই কৃষকরাই দিনের পর দিন দেশে ভালো উৎপাদন দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি কেনাকাটায় যে মূল্য নির্ধারণ করা হয় সেটা যদি শস্য কাটার আগে করা হয় তবে কৃষক বাজারে যাওয়ার আগেই একটি দামের ধারণা পাবেন। ফলে ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষির একটি সুযোগ তৈরি হবে। দামটাও ভালো পাবেন। এ জন্য এই দামটা মৌসুমের একদম শুরুর দিকেই ঘোষণা করা উচিত। নিয়মটা দ্রুতই পরিবর্তন না করলে কৃষকরা উপকৃত হওয়ার বদলে বঞ্চিত হতে থাকবেন।

তিনি বলেন, একদিকে আমাদের সক্ষমতার ঘাটতির কারণে ধান কেনা হয় কম। চাল কেনা হয় বেশি। যদিও ধান কেনার পরিমাণও বাড়ানো উচিত এবং এটাকে এমনভাবে সহজ করতে হবে যাতে সাধারণ কৃষকরা সরকারের কাছে জটিলতা ছাড়াই ধান বিক্রি করতে পারেন।

এ বছর কৃষি মন্ত্রণালয় এক কেজি ধানের উৎপাদন খরচ ৩৩ টাকার মধ্যেই রেখেছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ও চিন্তা করছে এর সঙ্গে লাভ যুক্ত করে গত বছরের মতো ৩৬ টাকাতেই ধান কিনতে। এদিকে গত বছর এক কেজি চালের উৎপাদন খরচের হিসাব ধরা হয় ৪৮ দশমিক ৮৮ টাকা। সেই হিসাবে ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৯ টাকা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, প্রতি বছর বোরো মৌসুমে ২ কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন হয়। গত ২০২৫ সালে ২ কোটি ১৩ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। যেটা এবারে ২ কোটি ২৭ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলেও প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে। বোরো মৌসুমেই চালের সবচেয়ে বড় উৎপাদন আসে। যা আসলে খাদ্য নিরাপত্তার ভিত নিশ্চিত করে।

গতকাল সোমবার হাওরের ধান যাতে নির্বিঘেœ কাটা হয় তা নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি মন্ত্রণালয়ের এক সভায় কর্মকর্তাদের বলেছেন, সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সমন্বয় করে যথাসময়ে হাওরাঞ্চলের ধান কাটা শেষ করতে হবে। যেসব অঞ্চলে ধান আগে কাটার উপযোগী সেখানে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে প্রয়োজনে হার্ভেস্টার ও ধান কাটার শ্রমিক এনে ধান কাটতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করারও নির্দেশনা দিয়েছেন মন্ত্রী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত