ধানসিঁড়িতে এক টুকরো মেঘ

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম

‘রাজশাহীর আঁচলঘেঁষা ধানসিঁড়ি নদী। নিথর স্বচ্ছ জল। সিলুয়েটে হারিয়ে যাওয়া থর থর সুদূর গ্রাম। কমলা-নীল আকাশের সাদা-কালোয় সাদামাটা পবিত্র নিস্তব্ধতা। দিবাশেষের শেষ সূর্যের ঘুমটি যখন পাচ্ছিল, তখন পথহারা এক টুকরো মেঘ সূর্যকে আলিঙ্গন করে বলে ‘যেতে নাহি দিব’। এসবের সাক্ষী এক গোছা কাশবন আর কোনো এক রমণী। প্রকৃতির আলিঙ্গনে কাঁখে কলসি হাতে বালতি নিয়ে ধরা পড়লেন আজিজুর রহমানের লেন্সে। জানি না, এই নদীর ঘাটে শিল্পী আজিজুর রহমান অস্তমান রবিকে শুধিয়েছিলেন কি না ‘কে তুমি?’ আলোকচিত্রশিল্পী আজিজুর রহমানের অমর সৃষ্টি ‘ধানসিঁড়ি নদী’ শিরোনামের ছবি নিয়ে কথাগুলো লিখেছিলেন বাংলাদেশের আরেক বরেণ্য আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন।

মাত্র ৩৭ বছরের জীবন ছিল আজিজুর রহমানের। এত স্বল্পায়ু জীবনে বিপুলা বাংলার কত না রূপ ক্যামেরায় ধরেছেন তিনি। পঞ্চাশের দশকে নাইব উদ্দিন আহমেদ, আমানুল হক আর ড. নওয়াজেশ আহমদ বাংলার সৃজনশীল আলোকচিত্রের যে ধারা তৈরি করেছিলেন আজিজুর রহমান যেন তাদেরই যোগ্য উত্তররসূরি। ষাট ও সত্তর দশকের দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকপত্র ও বিভিন্ন ছবির বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টালে তার সৃজনশীল আলোকচিত্রকর্মের একঝলক বিভা দেখা যায়। তার ছবি দেখে আমার কেবল জীবনানন্দ দাশের কবিতার কথা মনে হয়। পুরনো পত্রিকার পাতায় প্রথম তার তোলা ছবি দেখে ভাবি কে এই দৃশ্যশিল্পী; কোথায় থাকেন তিনি? আমার অগ্রজ-অগ্রগণ্য অনেক আলোকচিত্রীকে তার কথা বলি। কেউ তার নাম জানে না। এমন জাদুকরী শিল্পীর নাম জানে না বলে আমার বুকে চোট লাগে।

বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির (বিপিএস) এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক আরশাদ রণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বছর পাঁচেক আগে, এক ঘরোয়া আড্ডায়। কথায় কথায় আজিজুর রহমানের প্রসঙ্গ আসে। আরশাদ রণ বললেন, আজিজুর রহমান তার পরিচিত। বাল্যকাল থেকেই তিনি তাকে চেনেন। ঢাকার মধ্য বাসাবোতে ‘শ্যামলী’ নামে তার একটি স্টুডিও ছিল। ছেলেবেলায় তিনি সেই স্টুডিওতে গিয়ে অনেক ছবি তুলেছেন। আজিজুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। পরের দিন আরশাদ রণ আমার হোয়াটঅ্যাপ ম্যাসেঞ্জারে শিল্পী আজিজুুর রহমানের তিনটি ছবির ক্যাটালগ পাঠান। তিনিই আমাকে আজিজুর রহমানের মেয়ে অনিতা রহমানের ফোন নম্বর দেন। ফোনে তার বাবার সম্পর্কে জানতে চাইলে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন অনিতা। কয়েকদিন পর তিনি আমাকে তার বাবার একটি সাদাকালো পাসপোর্ট সাইজ ছবি পাঠান।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ‘ফটোগ্রাফি ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে আজিজুর রহমানের প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বাংলাদেশের কনটেম্পরারি আর্ট সিরিজের নবম পর্বের আয়োজন ছিল এটি। সেই সিরিজের ২৮তম পর্বে ১৯৮৩ সালে শিল্পকলা একাডেমি আবারো আজিজুর রহমানের আরেকটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘আজিজুর রহমান’। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক কেন এমন শিরোনাম? এমন শিরোনামের কারণ এই প্রদর্শনীর যখন আয়োজন করা হয় তখন তিনি অনন্তলোকে। এই প্রদর্শনী উপলক্ষে একটি ক্যাটালগও প্রকাশ করে শিল্পকলা।

এর দুই বছর পর ১৯৮৫ সালের ২ আগস্ট আজিজুর রহমানের স্ত্রী সবিতা রহমান ঢাকার ১২৪ মধ্য বাড্ডার বাসায় ‘আজিজ আলোকচিত্র সংগ্রহশালা’ গড়ে তোলেন। সে সময় একটি ক্যাটালগ প্রকাশিত হয়। সেই ক্যাটালগে আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগের ‘আজিজুর রহমান এবং তার জীবন’ ও আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেনের ‘প্রতিবিম্ব ও আজিজুর রহমান’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ ছাপা হয়। এই দুই পথিকৃৎ আলোকচিত্রশিল্পীর প্রবন্ধ পাঠে জানা যায় আজিজুর রহমানের চিত্রসম্ভার ও জীবনবৃত্তান্ত। ১৯৪০ সালে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার চারঘাট গ্রামে জন্মেছিলেন আজিজুর। ১৯৫৯ সালে এইচএসসি পাসের পর ‘টুইন লেন্স রিফ্লেক্স’ ক্যামেরার মায়ায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। পেশাগত জীবনে ছিলেন তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগ বা ডিএফপির নিজস্ব আলোকচিত্রী। পেয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পুরস্কার।

১৯৭১ সালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোলেন গণহত্যার ছবি। এ কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তার পবিত্র লেন্সকে অবমাননা করে। দুইবার তাকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে করা হয় লাঞ্ছনা। শেষে পুড়িয়ে দেয় তার বহু মূল্যবান প্রাণতুল্য সব নেগেটিভ। তাতে নিস্তব্ধ থাকেনি ক্যামেরা, নিস্তেজ হয়নি তার বিবেক। আজিজুর রহমানের তোলা গণহত্যার একটি মর্মস্পর্শী ছবি নিয়ে আনোয়ার হোসেন লিখেছেন “খাদে ইতিহাসের সাক্ষী গণকবর। পুষ্পাঞ্জলির মতো মাথার খুলি আর হাড়গোড়। ফ্রেমের উপরিভাগে শত শত জীবন্ত পা, আগামীর প্রতিশ্রুতি। ‘স্বাধীনতার মূল্য’ শীর্ষক এই আলোকচিত্রে আজিজুর রহমানের ক্যামেরা লিপিবদ্ধ করেছে মুক্তিযুদ্ধের জয়গান। জানি না, এ দৃশ্যের শাটার টেপার মুহূর্তে আজিজুর রহমানের হাত কেঁপেছিল কি না?”

মনজুর আলম বেগের লেখায় আজিজুর রহমানের কাজের বিশালতা উপলব্ধি করা যায়। ১৯৭৬ সালে ইউনেস্কোর এশিয়ান কালচারাল সেন্টার জাপানের টোকিও শহরে প্রথম এশীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৬টি দেশের আলোকচিত্রীরা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। ৬৩টি পুরস্কারের মধ্যে বাংলাদেশের সাতজন আলোকচিত্রী পান ১১টি পুরস্কার। আজিজুর রহমান একাই জেতেন পাঁচটি শিরোপা। বাংলাদেশি আলোকচিত্রীদের এমন অর্জন স্যালন ফটোগ্রাফির দুনিয়ায় বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করে তোলে। ওই প্রতিযোগিতায় আজিজুর রহমানের যে ছবিগুলো শিরোপা জিতে সেগুলোর শিরোনাম ‘ধানসিঁড়ি নদী’, ‘চিন্তান্বিতা’, ‘স্বাধীনতার মূল্য’, ‘বাউল’ ও ‘দুই শিল্পী’। ১৯৭৭ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে জাঁকজমক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই পুরস্কারের ডালি প্রদানের সব প্রস্তুতি যখন ঠিকঠাক তার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ১৩ জুলাই মাঝরাতে ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে জীবনের যতি টানেন আজিজুর রহমান!

পুনশ্চ : রাজশাহী অঞ্চলের কোথাও ধানসিঁড়ি নদীর অস্তিত্ব নেই। আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন হয়তো রূপক অর্থেই ‘রাজশাহীর আঁচলঘেঁষা ধানসিঁড়ি নদী’ লিখেছেন। আজিজুর রহমানের এই ছবির মধ্যে তিনি হয়তো জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদীর রূপ দেখতে পেয়েছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত