রূপপুরে স্বপ্নের বাস্তবতা

পারমাণবিক বিদ্যুতে আলো

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪২ এএম

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়েছে গতকাল। যার মধ্য দিয়ে রূপপুর কেন্দ্র থেকে ধাপে ধাপে শুরু হবে কাক্সিক্ষত বিদ্যুৎ উৎপাদন। ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া সফরকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রারম্ভিক পর্যায়ের কার্যাদি সম্পাদনের জন্য রাষ্ট্রীয় রপ্তানি ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করেন। এরপর ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর এবং ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিপাত্র বা রিঅ্যাক্টর প্রেশার ভেসেল স্থাপনের কাজ শুরু। তখন পদ্মা নদীর পানি ব্যবহার এবং তাপীয় দূষণের কারণে জলজ প্রাণী ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা করেছিলেন পরিবেশবাদীরা। সেই পরিস্থিতিতে, দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক এবং সামাজিক গুজব ডালপালা মেলেছিল। অনেকের জানা ছিল না, এতে পানি, কৃষি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি হবে না। বিশেষজ্ঞরা পরবর্তী সময়ে জানান, প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব। কারণ এটি কয়লা বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে না। কিন্তু পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে তৃতীয় প্রজন্মের (ঠঠঊজ-১২০০) প্রযুক্তি ব্যবহার এবং রাশিয়া ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (ওঅঊঅ) তত্ত্বাবধানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রাশিয়ার রোসাটোম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, ‘প্রকল্পটি শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তব রূপ। দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক। দুটি ইউনিট মিলে কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। যার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং হবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও চলছে পুরোদমে। পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে দেশের শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে নতুন গতি আনবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক পরমাণু বিশেষজ্ঞ ড. মো. শফিকুল ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় আশীর্বাদ। জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট, ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ আর পরিবেশগত দিক বিবেচনায় উন্নত বিশ্ব এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশকেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শেষ করে নতুন আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।

 তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইউরেনিয়ামের উপজাত বা ওয়েস্ট থেকে ভবিষ্যতে আবার জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব। যা ভারত ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো সফলভাবে পরীক্ষা করছে। সেটি সম্ভব হলে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরও কমে আসবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এ সময়ে এখান থেকে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। এরপর বাংলাদেশকে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হবে। তবে সেই জ্বালানি ২ বছর পরপর পরিবর্তন করলেই হবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, বর্তমান সরকার বিদ্যুতের গুরুত্ব অনুধাবন করে, নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য উদ্যোগী হবে। পারমাণবিক শক্তিতে দেশ আলোয় প্রস্ফুটিত হোক, গড়ে উঠুক নতুন বাংলাদেশ। বাস্তবতা পাক দীর্ঘ সময়ের লালিত স্বপ্ন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত