গত মে মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়েছে সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা। ওভারটাইমও দিতে হয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। বেতন আর ওভারটাইম প্রায় সমানই। কেউ কেউ এক মাসে ২১৫ ঘণ্টাও ওভারটাইম পেয়েছেন। এ ঘটনা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার তেল, গ্যাস উৎপাদন কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডে। এ কোম্পানিতে ওভারটাইমের নামে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর দুদক সিলেট অফিসের একটি বিশেষ টিম অভিযান চালায়। তখন কোম্পানির কর্মচারীদের দৈনিক কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত কর্মকাল তথা ওভারটাইমের নামে দুর্নীতির সত্যতা পায় দুদক। এরপরও ওভারটাইমের নামে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এ দুর্নীতি থেমে নেই।
কোম্পানিটির গত মে মাসের বেতন শিট দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানী টিমের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, কোনো কোনো কর্মচারীর নামে ১৫০-২০০ ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম দেখিয়ে ৩৫-৫০ হাজার টাকা, অর্থাৎ মূল বেতনের চেয়েও দেড়-দুই গুণ অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনের পে-সিøপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হরিপুর ফিল্ডে কর্মরত (ফোরম্যান) ফয়জুল করিমের মূল বেতন ২৬,১০০ টাকা। তিনি ২১৫ ঘণ্টা ওভারটাইম বাবদ ৫৩,৯৫৭ টাকাসহ সব মিলিয়ে বেতন তুলেছেন ৯৮,২০২ টাকা।
রশিদপুর সিআরইউ প্ল্যান্টে কর্মরত সাদেক আলীর মূল বেতন ২৫,৩২০ টাকা। তিনি ১৭৬ ঘণ্টা ওভারটাইম বাবদ ৪২,৮৫০ টাকাসহ মোট ৮৭,৯২৬ টাকা বেতন তুলেছেন। কৈলাশটিলা ফিল্ডের লোকমান উদ্দিনের মূল বেতন ২০,৩৯০ টাকা। তিনি ২১২ ঘণ্টা ওভারটাইমের ৪১,৫৬৫ টাকাসহ মোট ৭৭,৭৯৫ টাকা পেয়েছেন। প্রধান কার্যালয়ের ২৮,৭৯০ টাকা মূল বেতনের কর্মচারী নূর উদ্দিন ১৫০ ঘণ্টা ওভারটাইমের ৪১,৫২৫ টাকাসহ মোট ৮৯,৪৪০ টাকা পেয়েছেন। রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডের ২৬,০০০ টাকা মূল বেতনের কর্মচারী মো. আবদুল ওয়াদুদ ১৬৫ ঘণ্টা ওভারটাইমের ৪১,২৫০ টাকাসহ ৮৫,৮৫৫ টাকা উত্তোলন করেছেন।
মে মাসের বেতন সামারি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ওভারটাইমপ্রাপ্ত কর্মচারীরা এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন গ্রেডে কর্মরত কর্মকর্তা এমনকি ৫ম গ্রেডের অনেক কর্মকর্তার চেয়েও অধিক বেতন উত্তোলন করেছেন। উপব্যবস্থাপক (ষষ্ঠ গ্রেড) এমরানুল হক চৌধুরী সর্বসাকল্যে ৫৯,১৮৮ টাকা, সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) মো. আনসারুল আলম সর্বসাকল্যে ৪০,০৩০ টাকা। কর্মচারী পর্যায়ের লোকজন কর্মকর্তাদের থেকেও অধিক আয়ের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাও চরমভাবে বিঘিœত হচ্ছে। তারা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আদেশের কোনোরূপ তোয়াক্কা করে না।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে মে মাসের বেতন ছিল ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৭০৫ টাকা। ওভার ওভারটাইম খাতে কোম্পানির ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৬ টাকা, যা বছরে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অথচ এই টাকায় ১৪তম গ্রেডের ১৭০ জন নতুন কর্মচারীর বেতন দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু সিবিএ নেতা ও স্থানীয় কর্মচারীদের বাধায় কর্মচারী পদে ৩০ বছর ধরে এই কোম্পানিতে নিয়োগ বন্ধ। তাদের শঙ্কা নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিলে তাদের চলমান ওভারটাইম বন্ধ হয়ে যাবে।
জানা যায়, এ ওভারটাইম প্রদানের জন্য দৈনিক কোনো রেকর্ড রাখা হয় না। দুদকের অভিযানের পর রেজিস্ট্রার মেইনটেন করলেও তা নামমাত্র। মাসের শেষ দিন কর্মচারীরা ইচ্ছামতো একসঙ্গে ওভারটাইম দাখিল করেই টাকা তুলে নিচ্ছে। অথচ নিয়ম হচ্ছে, প্রতিদিনের ওভারটাইম আগের দিন অনুমোদন নিতে হয় এবং দিনশেষে প্রকৃত ওভারটাইম প্রত্যয়ন করতে হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অসাধু কিছু কর্মকর্তাও এ দুর্নীতির সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত। তারা ভুয়া ওভারটাইম দেখিয়ে অধীনস্থ কর্মচারীকে বেতনের সঙ্গে ৪০-৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের সুযোগ করে দেয়। আর সেখান থেকে একটা অংশ তিনিও পান। উল্লেখ্য, কর্মকর্তাদের নামে ওভারটাইম দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের সুযোগ না থাকায় তাদের একাংশও এ দুর্নীতিতে জড়িত।
জানা যায়, ১৯৯৬ সালের পর এই কোম্পানিতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কর্মচারী পর্যায়ে কোনো নিয়োগ হয়নি। ২০০৬ সালে বিশেষ কৌশলে কোম্পানির বোর্ড অনুমোদনের মাধ্যমে এবং ২০১৭ সালে শুধু হাইকোর্টের রায়ের ওপর ভিত্তি করে কিছু ক্যাজুয়াল শ্রমিক কর্মচারী হিসেবে স্থায়ী হয়। ২০১১ ও ২০২১ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও এসব দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের বাধায় তা আলোর মুখ দেখেনি। তা ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৩০০ শ্রমিক কাজ নেই, মজুরি নেই ভিত্তিতে অস্থায়ী নিয়োজিত রয়েছে। এরা সবাই আগের সরকারের সময়ের রাজনৈতিক নিয়োগ।
বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায় যে, এসব নৈমিত্তিক শ্রমিকদের নিয়োগের সময় ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। পরে তাদের কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের ক্যান্টিন ঠিকাদারের কাগজপত্রে নিয়োগ দেখিয়ে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী, এসব নৈমিত্তিক শ্রমিকের নিয়োগকর্তা ঠিকাদার, কোম্পানি নয়। এদের বেশিরভাগই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী ও স্থানীয় নেতাদের আত্মীয়স্বজন। এদিকে জনবল সংকটেও সিবিএ নেতা ও এই স্থানীয় শ্রমিকদের বাধার কারণে কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি এসব নৈমিত্তিক শ্রমিক চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে কোম্পানির কয়েকজন জিএমকে প্রধান কার্যালয়ের একটি রুমে আটকে রাখে। প্রায় ৪ ঘণ্টা পর পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করলেও দুষ্কৃতকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ দুদকের অভিযানের সময় তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌ. রেজাউল ইসলাম নিয়মবহির্ভূত ওভারটাইম প্রসঙ্গে অনেক চলমান প্রকল্প, জনবল সংকট ও ২৪ ঘণ্টা প্রোডাকশনের কথা বললেও বাস্তবে চলমান কোনো প্রকল্পেই কোনো স্থায়ী কর্মচারী নেই এবং প্ল্যান্টগুলোতে ৩টি শিফট করে দেওয়া আছে। এমনকি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নিয়মিত অফিস করা কর্মচারীরাও বেতনের সঙ্গে প্রতি মাসে ৮০-১০০ ঘণ্টা ভুয়া ওভারটাইম ভাতা নিচ্ছেন। অফিস বন্ধের দিনেও তারা ওভারটাইম দেখান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, কর্মচারী সংকটের কারণে এ রকম হলে কারও ক্ষেত্রে ওভারটাইম ২০০ ঘণ্টা, কারও ক্ষেত্রে ৩০-৪০ ঘণ্টা হতো না। আরেক কর্মচারী জানান, কোম্পানিতে দুটি শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে যারা সিবিএ হয়েছে, তাদের ভোটারদের পক্ষে কর্মকর্তাদের থেকে জোরপূর্বক ১০০-২০০ ঘণ্টা ভুয়া ওভারটাইম প্রত্যয়ন করে নেয়। আর প্রতিপক্ষের ভোটারদের ৩০-৪০ ঘণ্টা এমনকি শূন্য ঘণ্টা পর্যন্ত দেওয়া হয়।
শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর দৈনিক কর্মঘণ্টা সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টার বেশি হতে পারবে না। সেই হিসাবে সপ্তাহে ১২ ঘণ্টা ও মাসে ৪৮ ঘণ্টার বেশি ওভারটাইম দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোম্পানিতে সার্ভিস রুল এবং বহু নীতিমালা থাকলেও ওভারটাইম সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা নেই। প্রতি বছর ওভারটাইম খাত নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তি দিয়ে থাকলেও সেগুলোর কোনো সুরাহা করে না। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার নিরীক্ষা আপত্তি জমে আছে। অনেক বছর হয়ে গেলে এসব আপত্তি জাতীয় সংসদে নিয়ে নিষ্পত্তি করা তথা আপত্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
২০২০ সালে এই ওভারটাইম দুর্নীতি বন্ধে ফিঙ্গারপ্রিন্ট হাজিরার জন ডিভাইস বসালে এ কর্মচারীরা সেগুলো খুলে নিয়ে যায়। বর্তমানে ফিঙ্গারপ্রিন্টের একটি কাজ চলমান থাকলেও এর মাধ্যমে শুধু কর্মকর্তাদের হাজিরা প্রতিবেদন নেওয়া হবে, কর্মচারীদের নয়। জানা যায়, কর্মচারী ইউনিয়ন থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট হাজিরায় তাদের অন্তর্ভুক্ত না করতে কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে হুমকি দেওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ওভারটাইম দুর্নীতি রুখতে কর্মকর্তাদের একটি অংশ চাইলেও কোম্পানিতে ২০১৮ সালের পর কোনো অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচন হয়নি। কোম্পানিতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভয়াবহ বদলি বণিজ্যও করছেন কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারা। সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের ৫টি অফিস সিলেট বিভাগের ৩টি জেলায় অবস্থিত। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাউকে অসুবিধাজনক জায়গায় বদলি করে পরে ঘুষ নিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় বদলি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যয় সংকোচনের বললেও এ কোম্পানিতে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম। এভাবেই ধ্বংস হয়েছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আদমজী জুটমিল। জ্বালানি খাতের এ প্রতিষ্ঠানও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। তাই অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, গত ৩০ বছরে সিবিএ ও স্থানীয়দের বাধায় কোনো স্টাফ রিক্রুটমেন্ট করতে পারিনি। কিছু স্থানীয় ব্যক্তি কোনো পরীক্ষা ছাড়াই তাদের লোক নিয়োগ দিতে বলে। সে কারণে চেষ্টা করেও স্টাফ নিয়োগ দিতে পারিনি।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তারেক আহমদের সঙ্গে কথা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। বোর্ড চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজুল্লাহ বলেন, লোকবল সংকট আছে। তবে বিস্তারিত এমডি সাহেব বলতে পারবেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, লোকবল স্বল্পতার কারণেই যারা বিদ্যমান আছে তাদের দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। সিবিএ সভাপতি প্রদীপ কুমার শর্মা বলেন, কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। স্টাফ কম আছে। সে জন্য ওভারটাইম বেশি হয়। যদি রিক্রুট করা যেত, তাহলে এত ওভারটাইম হতো না।