গত শুক্রবার মসজিদে নববির জুমার খুতবায় শায়খ ড. আবদুল বারি আস-সুবাইতি মানুষের জীবনের অবিরাম প্রচেষ্টার কথা তুলে বলেন, সব মানুষই কাজ করছে, তবে তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। নিয়তই আমলের মর্যাদা নির্ধারণ করে। দুনিয়ার কাজও সৎ নিয়তে ইবাদতে পরিণত হয়। প্রচেষ্টা দুই ধরনের। আল্লাহমুখী প্রচেষ্টা বরকতপূর্ণ ও কবুলযোগ্য আর লক্ষ্যহীন প্রচেষ্টা পরিশ্রম সত্ত্বেও ব্যর্থ। কোরআন মানুষকে নিজের কাজ ও উদ্দেশ্য যাচাই করতে আহ্বান জানায়। আখেরাতমুখী সঠিক প্রচেষ্টাই সফলতা আনে। এ চেতনা সমাজে ছড়িয়ে পড়লে ঐক্য, কল্যাণ ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুসলিম উম্মাহ শক্তিশালী হয়।
শায়খ বলেন, যদি মানুষের জীবনের গতিবিধির দিকে তাকান, তবে দেখবেন সব মানুষই ছুটে চলছে। কেউ স্থির নেই। কেউই কাজ থেকে বিরত নয়। কোরআন এই দৃশ্যটি এভাবে তুলে ধরেছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন ধরনের।’ (সুরা লাইল ৪) মানুষের এই প্রচেষ্টা প্রকাশ্য দৃষ্টিতে এক মনে হলেও তুলাদণ্ডে তা ভিন্ন ভিন্ন। কারণ কাজ একই মনে হলেও উদ্দেশ্য থাকে আলাদা। কেউ কাজ করে দুনিয়ার জন্য, কেউ আখেরাতের জন্য, আবার কেউ জানেই না সে কেন ছুটছে। হাতের নড়াচড়া হয়তো এক, কিন্তু হৃদয়ের অভিমুখই আসল পার্থক্য তৈরি করে দেয়। কারণ ইখলাসের মাধ্যমেই আমল উচ্চমর্যাদা পায়।
ইসলামে প্রচেষ্টা কেবল নামাজ বা প্রকাশ্য ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আরও বিস্তৃত ও ব্যাপক। মানুষের কাজ, ঘর-সংসার, ব্যবসা, শিক্ষা, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তের সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, পরিবারের কর্তাসহ সবাই প্রচেষ্টা করে। প্রত্যেকেই হয়তো মহান আল্লাহর দিকে ধাবিত হচ্ছে অথবা তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এখান থেকেই প্রচেষ্টার এই ব্যাপকতাকে নিয়ন্ত্রণ করার মূলনীতিটি ফুটে ওঠে আল্লাহর এই বাণীর মাধ্যমে, ‘আর প্রত্যেকের জন্যই একটি দিক রয়েছে, যেদিকে সে মুখ ফিরায়।’ (সুরা বাকারা ১৪৮)
কাজ দেখতে একই রকম হতে পারে, কিন্তু অন্তরের লক্ষ্যই সেটিকে ওপরে তোলে বা নিচে নামায়। শিক্ষার ক্ষেত্রে দুজন হয়তো শিখছে, কিন্তু সফল হয় একজন, কারণ সে সংশোধনের ইচ্ছা পোষণ করেছে। আর অন্যজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ সে লোক দেখানো সুনাম চেয়েছিল। ব্যবসার ক্ষেত্রে দুজন ব্যবসা করছে, কিন্তু একজনের ওপর বরকত নাজিল হয়, কারণ সে হালাল উপার্জন ও মানুষের সেবার ইচ্ছা পোষণ করেছে। আর অন্যজন বঞ্চিত হয়, কারণ তার লক্ষ্য ছিল কেবল
অর্থ উপার্জন।
এভাবেই প্রচেষ্টা দুভাগে বিভক্ত। প্রশংসিত প্রচেষ্টা ও বিফল প্রচেষ্টা। প্রশংসিত প্রচেষ্টা হলো সেটি, যা জীবনকে কর্মচঞ্চল করে, কিন্তু তার অভিমুখ থাকে আল্লাহর দিকে। নেক নিয়তের মাধ্যমে দুনিয়াবি কাজও ইবাদতে রূপান্তরিত হয় এবং তার প্রভাব ও বরকত বৃদ্ধি পায়। যেমন ইবাদতের শক্তি অর্জনের নিয়তে ঘুমানোও একটি ইবাদত, নিপুণভাবে কাজ করা ইবাদত, পরিবারের পেছনে ব্যয় করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়, মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা ইহসান, বাবা-মায়ের সেবা করা মর্যাদা লাভের উপায়, সন্তানদের লালন-পালন করা আমানত এবং পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা। (সহিহ বুখারি)
সুন্দর কথা বলা সদকা। কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা গোপন ইবাদত। লেনদেনে ইনসাফ করা প্রকাশ্য ইবাদত। নিয়ত সঠিক হলে প্রতিটি সাধারণ কাজও ইবাদতে পরিণত হয় এবং দৈনন্দিন কাজগুলো মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের ওসিলা হয়। তখন সামান্য কাজও মহান হয়ে ওঠে, কারণ হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরেছে এবং নিয়ত হয়েছে স্বচ্ছ।
অন্যদিকে বিফল প্রচেষ্টা হলো সেটি, যেখানে পরিশ্রম অনেক, কিন্তু নিয়ত অনুপস্থিত এবং লক্ষ্য-উদ্দেশ্যহীন। এর কর্তা অনেক কাজ করে, কিন্তু জানে না সে কেন করছে। সে কোনো দিশা ছাড়াই চলতে থাকে, আর গন্তব্যে পৌঁছে দেখে কিছুই নেই। কোরআন এই অবস্থাকে মরুভূমির মরীচিকার সঙ্গে তুলনা করেছে। এটি এমন এক প্রচেষ্টা, যেখানে শ্রম আছে কিন্তু ফলাফল শূন্য। কারণ এর লক্ষ্য আল্লাহ থেকে সরে গিয়ে সুনাম অর্জন, প্রবৃত্তির অনুসরণ, খ্যাতির পেছনে ছোটা বা মানুষের সন্তুষ্টির দিকে ঘুরে গেছে। ফলে এই প্রচেষ্টা দেখতে বিশাল হলেও এর মূল্য খুবই সামান্য। দিন যায়, কাজের পাহাড় জমে, কিন্তু মানুষ নিজেকে জিজ্ঞেস করে না যে আমি কোথায় যাচ্ছি, যতক্ষণ না সে হঠাৎ পথের শেষে পৌঁছে যায় এবং দেখে যে তার জীবন সেই লক্ষ্যের বাইরেই ব্যয় হয়েছে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলো, ‘আমি কি তোমাদের এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করছে যে, তারা ভালো কাজই করছে।’ (সুরা কাহাফ ১০৩-১০৪) এই আয়াতটি প্রত্যেক মানুষকে ভাবতে আহ্বান জানায়, আমি যা করছি তা কি সঠিক? এটি কি হেদায়েতের ওপর আছে? আমি কি এর দ্বারা আল্লাহকে চাচ্ছি নাকি অন্য কিছু?
কোরআন এমন এক তুলাদণ্ড স্থাপন করেছে, যা মানুষকে তার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে এবং তাকে পূর্ণ দায়িত্বশীল করে তোলে, যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যা সে চেষ্টা করে আর তার প্রচেষ্টা অচিরেই দেখা হবে।’ (সুরা নাজম ৩৯-৪০)
অন্য কেউ তার কাজের ভার বহন করবে না, তার নাম বা পদমর্যাদা তার কোনো কাজে আসবে না। তার প্রকৃত সম্পদ কেবল তার আমল বা প্রচেষ্টা, যা সে একদিন নিজের সামনে উপস্থিত দেখবে। সেদিন কাজের প্রতিটি মুহূর্ত এবং নিয়তের গোপন রহস্য উন্মোচিত হবে। যখন এই বিশ্বাস অন্তরে প্রোথিত হয়, তখন মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছুর জন্য প্রচেষ্টার আর কোনো মূল্য থাকে না। এখানে কোরআন কবুল হওয়ার পথ বাতলে দিয়ে বলছে, ‘যে ব্যক্তি আখেরাত চায় এবং তার জন্য সঠিক চেষ্টা করে এমতাবস্থায় যে সে মুমিন, তবে তাদের প্রচেষ্টা হবে পুরস্কার যোগ্য।’ (সুরা ইসরা ১৯) যারা আখেরাত চায়, তারা হৃদয়কে স্থির করে, লক্ষ্যকে সঠিক করে এবং শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক প্রচেষ্টা চালায়। ফলে তাদের কাজ হয় কবুল হয়। আল্লাহ তার প্রশংসা করেন এবং বহুগুণ প্রতিদান দেন।
যখন হৃদয় তার প্রচেষ্টায় পূর্ণরূপে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট হয়, তখন নফস পবিত্র হয়, হিংসার আগুন নিভে যায় এবং বিদ্বেষ বিলীন হয়ে যায়। মানুষ তখন ছোটখাটো প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে ঊর্ধ্বে রাখে এবং ক্ষণস্থায়ী বস্তুর জন্য ভিড় করে না। তার লক্ষ্য তখন নির্মাণ, সংস্কার ও নিপুণতার দিকে ধাবিত হয়। এরপর এই চেতনা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে মানুষের প্রচেষ্টার লক্ষ্য সুউচ্চ হয়, সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার হয় এবং একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। তখন সমস্ত শক্তি উপকারী দান, প্রভাবশালী প্রকল্প ও জনকল্যাণে রূপান্তরিত হয়। কারণ সব হৃদয় একই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং এর ফলেই সফলতা ও কবুল হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে।
আপনারা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করুন। হে আল্লাহ! আপনি তার ওপর রহমত, শান্তি ও বরকত নাজিল করুন, যতবার স্মরণকারীরা তাকে স্মরণ করে এবং যতবার গাফেলরা তার কথা ভুলে থাকে। হে আল্লাহ! আমাদের জন্য তার সুপারিশ নসিব করুন এবং তার সুন্নতের অনুসারী ও তার হেদায়েতের ওপর বিচরণকারী হিসেবে কবুল করুন।
হে আল্লাহ! আপনি ইসলাম ও মুসলিমদের মর্যাদা দান করুন, তাদের অবস্থা সংশোধন করুন এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। হে আল্লাহ! মুসলিমদের ঘরবাড়ি রক্ষা করুন এবং ফিলিস্তিনসহ সব জায়গায় তাদের সাহায্যকারী ও রক্ষাকারী হোন। হে আল্লাহ! যে আমাদের ও মুসলিম ভূখণ্ডের অমঙ্গল চায়, আপনি তাকে তার নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত রাখুন, তার চক্রান্তকে তার ধ্বংসের কারণ বানিয়ে দিন এবং তার ষড়যন্ত্র তার দিকেই ফিরিয়ে দিন।
২৪ এপ্রিল শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান
