বেসরকারি খাতেই ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতি

আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ০১:৫০ এএম

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও বিনিয়োগে স্থবিরতা স্পষ্ট, আর সেই স্থবিরতা কাটিয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর মূল দায়িত্ব নিতে হবে বেসরকারি খাতকেই, এমনটাই দাবি করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, নীতি-স্থিতিশীলতা, ব্যবসা সহজীকরণ ও আর্থিক খাতের সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগই অর্থনীতির চাকা সচল করতে পারে। কারণ অর্থনীতির গতি ফেরাতে বড় ভরসা এখন বেসরকারি খাত।

জানা গেছে, সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে নতুন অর্থবছর ২০২৬-২০২৭ সালের বাজেট প্রস্তুত করছে। বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কর সুবিধা, বিনিয়োগ সহজীকরণ ও আর্থিক খাত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে অবকাঠামো ও জ¦ালানি খাতে উন্নয়ন, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং বৈদেশিক লেনদেন সহজ করার উদ্যোগও গুরুত্ব পেতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে অর্থনীতিতে এক ধরনের দ্বৈত চিত্র দেখা যাচ্ছে, একদিকে রিজার্ভে স্বস্তি, অন্যদিকে বিনিয়োগে ধীরগতি। দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপে টানা তৃতীয় বছরের মতো কমেছে বেসরকারি বিনিয়োগ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য (এপ্রিল ২০২৬) অনুযায়ী, দেশের গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি (৩৫ দশমিক ১২ বিলিয়ন) হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, রিজার্ভের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আরও জোরদার হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভ বাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক হলেও একে একমাত্র নিয়ামক হিসেবে দেখা যায় না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতি-স্থিতিশীলতা, ব্যবসা সহজীকরণ, জ¦ালানি সরবরাহ ও আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বড় ভূমিকা রাখে।

ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। এ বছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে তা আরও কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর আগে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

বিনিয়োগ কমার পেছনে প্রথমত আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশ দুর্বল রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। প্রায় এক দশক আগেই এই সমস্যা চিহ্নিত হয়েছিল। কত সহজে ব্যবসা করা যায় তা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রিজার্ভ বাড়ছে, এটি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখা ও বৈদেশিক লেনদেন সহজ করার জন্য আমরা কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা এবং আর্থিক খাতের সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক শেখ মনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈদেশিক বিনিয়োগ কম আসার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত কারণ কাজ করছে। নীতি স্থিতিশীলতার অভাব এবং ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। ডলার সংকট, এলসি খোলা ও মুনাফা সহজে দেশে নিতে না পারার আশঙ্কাও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

পাশাপাশি চুক্তি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা, ধীরগতির অনুমোদন প্রক্রিয়া ও অনানুষ্ঠানিক খরচ বিনিয়োগ পরিবেশকে কঠিন করে তুলছে। ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদের হার ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ঘাটতিও বড় বাধা। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো দ্রুত সেবা, বড় বাজার ও প্রণোদনার মাধ্যমে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। দেশীয় বিনিয়োগ প্রবাহও দুর্বল থাকায় বিদেশিরা নতুন ঝুঁকি নিতে আরও সতর্ক হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, রিজার্ভ বাড়া অর্থনীতির জন্য স্বস্তির হলেও বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের গতি শ্লথ হতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই ইতিবাচক রিজার্ভ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। শুধু বেসরকারি বিনিয়োগ নয়, সরকারি খাতেও উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার কম। বরাদ্দকৃত অর্থও পুরোপুরি ছাড় হচ্ছে না। ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও দরিদ্র মানুষের আয়বর্ধক কার্যক্রমগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট তাসকিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন,  দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের এই খরা কাটাতে বিদ্যমান নীতিগত অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও সংস্কারের ধীরগতির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’  নীতি অবলম্বন করছেন। এ ছাড়া নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন দেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরাচ্ছে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাব ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেবাসমূহ পূর্ণাঙ্গভাবে অটোমেটেড না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক কর কাঠামোর অভাবে বিনিয়োগের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকা চেম্বার মনে করে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে, সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে, সহজ বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ, অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি সিংগেল উইন্ডো কার্যকর করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ সুদের হার এবং ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা দেশি উদ্যোক্তাদেরও নিরুৎসাহিত করছে। ফলে রিজার্ভ বাড়লেও বাস্তবে বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি আসছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত