বহুদিন পর মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে জমজমাট ভাব। সাপ্তাহিক ছুটির দিন, মেঘলা দিনে নেই সূর্যের খরতাপে পোড়ার ভয়। মাহে রমজান, গরম সবকিছু মিলিয়ে গত বেশ কিছুদিন ধরে মাঠে এসে ক্রিকেট দেখতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছিল। শনিবার অনেকেই এসেছিলেন বাংলাদেশকে সিরিজ জিততে দেখার আশায়। সেই সম্ভাবনায় আক্ষরিক অর্থেই জল ঢেলে দিয়েছে বৃষ্টি, আর সেই জল ঘোলা করলেন বেভন জ্যাকবস। বৃষ্টিতে মিনিট ত্রিশেক খেলা বন্ধ থাকার পর ফের যখন শুরু হয়, তখন ওভার সংখ্যা কমিয়ে করা হয় ১৫। থেমে যাওয়ার আগে আর পরের ছন্দটা মেলাতে পারেনি বাংলাদেশ, অলআউট হয়ে গেছে ১০২ রানে। জ্যাকবসের ৩১ বলে ৬২* রানের ইনিংসে সেই রানটা ২০ বল আর ৬ উইকেট হাতে রেখেই ছাড়িয়ে গেছে নিউজিল্যান্ড। রিশাদ হোসেনের বলে মারা ডিন ফক্সক্রফটের ছক্কায় শেষ হয়েছে নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশ সফর, টি-টোয়েন্টি সিরিজের সমাপ্তি ১-১ সমতায়।
টস জিতে নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক নিক কেলি বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ে পাঠান, ম্যাচের পরে জানিয়েছেন বৃষ্টির আশঙ্কা করেই তার এই সিদ্ধান্ত। সাইফ হাসান, তানজিদ তামিম দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ভালো শুরু এনে দিতে পারেননি, তার ওপর পারভেজ হোসেন ইমনও প্রথম বলে বোল্ড। ৩৫ রানে ৩ উইকেট হারানো বাংলাদেশ লিটন দাস আর তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, তখনই নামল বৃষ্টি। ৬.৪ ওভারে নামে বৃষ্টি, চলে আধঘণ্টারও বেশি। এরপর মাঠ শুকিয়ে প্রস্তুত করে খেলার উপযোগী করতে করতে নষ্ট হয়ে যাওয়া সময় পুষিয়ে নিতে কমানো হয় ওভার। প্রতি ইনিংস নির্ধারণ করা হয় ১৫ ওভারে। ফলে খেলা শুরুর পর বাংলাদেশের হাতে থাকে মাত্র ৯ ওভার, এই সময়ে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক হয়ে খেলতে গিয়ে ইনিংস শেষের ৪ বল আগে অলআউটই হয়ে যায় লিটনের দল। অধিনায়ক ১৭ বলে ২৬ আর তাওহীদ হৃদয় ২৪ বলে করেন ৩৩ রান। এই দুজন আউট হতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের বাকি ব্যাটিং লাইনআপ। ৬৩ রানে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন লিটন, বাংলাদেশ অলআউট হয় ১০২ রানে। শেষ ৭ ব্যাটসম্যান মিলে করেছেন ৩৯ রান, গোটা ইনিংসে ৩ জন রান করেছেন দুই অঙ্কে আর বাকিরা সবাই এক অঙ্কের রানেই আউট হয়ে যান।
১০২ রানের অল্প পুঁজিটাও বাঁচিয়ে দিতে পারতেন শরিফুল ইসলাম। বল হাতে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং ইনিংসের শুরুতেই জোরালো ধাক্কা দিয়েছেন এই বামহাতি পেসার। দ্বিতীয় ডেলিভারিতেই কিটন ক্লার্ককে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেছেন উইকেটের পেছনে, একই ওভারের শেষ বলে অনেকটা একই ভাবে নেন ডেন ক্লিভারের উইকেটও নিজের পরের ওভারের প্রথম বলে ভাঙেন টিম রবিনসনের স্টাম্প। ২৫ রানেই ৩ উইকেট নেই ব্ল্যাকক্যাপদের, এরপর শেখ মেহেদি হাসানের বলে অধিনায়ক নিক কেলি বোল্ড হয়ে গেলে কিউইদের চাপে ফেলে বাংলাদেশ। তবে একপ্রান্তে শরিফুল চাপে রাখলেও অন্যপ্রান্তে রিপন ম-ল ও রিশাদ হোসেনের বেহিসাবি বোলিং রান-রেটের চাপে ফেলতে পারেনি নিউজিল্যান্ডকে। জ্যাকবসের ৫ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় ৬১ বলে ৬২* রানের ইনিংসের সঙ্গে ডিন ফক্সক্রফটের ১৫* রানে অনায়াসেই ম্যাচটা জিতে সিরিজে ১-১ সমতা আনে নিউজিল্যান্ড। বৃষ্টিতে ভিজে অনেকটা সময় অপেক্ষা করে যারা বাংলাদেশকে জিততে দেখার আশায় স্টেডিয়ামে থেকে গিয়েছেন, তাদের প্রাপ্তি শুধুই হতাশা।
শীর্ষ ক্রিকেটারদের ছাড়া বাংলাদেশ সফরে আসা নিউজিল্যান্ডের এই দলটার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ প্রথম ম্যাচ হেরে ২-১ ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ, টি-টোয়েন্টি সিরিজে শুরুতে জিতে শেষ ম্যাচটা হেরেছে। এমন সিরিজে দুই দলের প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ জানতে চাওয়া হয়েছিল দুই অধিনায়কের কাছেই। তাদের উত্তর বিশ্লেষণ করে মনে হবে, নিউজিল্যান্ডের প্রাপ্তির পাল্লাই শেষ পর্যন্ত ভারী।
লিটন বলেছেন তাসকিন ও মোস্তাফিজকে বাদ দিয়ে বোলিং বিভাগটাকে বাজিয়ে দেখাটা প্রাপ্তি, তবে অভিজ্ঞদের ছাড়া বাংলাদেশের জয় মাত্র এক ম্যাচে এবং সেই ম্যাচটাতেও ১৮৩ রান দিয়েছিল বোলাররা। বরং নিক কেলি বলেছেন, এই সফর থেকে যারা দেশে ফিরবে তারা দেশে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভােেলা করে নিয়মিত ক্রিকেটারদের ওপর চাপ বাড়াতে চেষ্টা করবে যাতে পরের সুযোগটা পেতে খুব বেশি অপেক্ষা করতে না হয়।
মহাভারতের যুদ্ধে কর্ণের ছোড়া বাণে অর্জুনের রথ কয়েক হাত পিছিয়ে যেত আর অর্জুনের বাণে কর্ণের রথ পেছাত সামান্য। অর্জুনের সারথি কৃষ্ণ তবু কর্ণের প্রশংসা করলে এই নিয়ে অর্জুনের খানিকটা আক্ষেপই ছিল। তখন কৃষ্ণ বলেন যে অর্জুনের রথের চাকায় নাগদেবতা, চূড়ায় হনুমান আর সারথি কৃষ্ণ, তারপরও যে কোনো মানুষ এই রথ নড়াতে পারছে সেটাই তো কৃতিত্ব! নিউজিল্যান্ড দলের বাংলাদেশ সফরের লাভক্ষতির হিসাব তাই স্রেফ কোন দল কতটা ম্যাচ জিতেছে সেই অঙ্কে সীমাবদ্ধ করাটা হবে বোকামি। শীর্ষ ক্রিকেটাররা নেই, উইকেটের সঙ্গে অভ্যস্ততা নেই, আবহাওয়াও প্রতিকূল। সবকিছু সামলে নিয়ে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচটা জেতা, চট্টগ্রামে টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচটাতেও আগে ব্যাট করে ১৮৩ রান করা এবং ঢাকায় ম্যাচটা বড় ব্যবধানে জিতে নেওয়া। এই সফরে স্রেফ হারজিতের চেয়ে নিউজিল্যান্ড দলের বড়প্রাপ্তি একঝাঁক নতুন ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। ২০২১ সালে ৫ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে টম ল্যাথামেরই নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ডের যে দলটা এসেছিল, সেই দলে কেন উইলিয়ামসন, গ্লেন ফিলিপস, মিচেল স্যান্টনাররা কেউ আসেননি। আসেননি সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অজানা রাচিন রবীন্দ্র, আইজাজ প্যাটেল, ফিন অ্যালেনরা। প্রতিপক্ষে লিটন, নাসুম, শরিফুল, শামীমরাই ছিলেন। ৫ বছর পর রাচিন রবীন্দ্র , ফিন অ্যালেনরা খেলছেন আইপিএলে আর লিটনদের অগ্রগতি সামান্যই।
