আবহাওয়ায় এবার ব্যতিক্রমী ‘মে’

আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম

এপ্রিল ও মে মাস দেশের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডও এই মে মাসে। ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পারদ উঠেছিল। এপ্রিল ও মে মাসের তাপদাহের পরই জুনে মৌসুমি বায়ুর আগমনে দেশে বৃষ্টি শুরু হয়ে থাকে। তবে এবারের আবহাওয়া ভিন্ন হতে যাচ্ছে। এপ্রিলে এবার ৩২ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাতে তাপদাহের প্রভাব যেমন বাড়তে পারেনি তেমনিভাবে মে মাসেও কালবৈশাখীর বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাড়বে না তাপপ্রবাহ।

তাহলে কি মে মাসে গরম কম পড়বে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় দেশের ৪৬ বছরের আবহাওয়ার উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করা আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবারের মে ব্যতিক্রম হতে যাচ্ছে। মাসের প্রথম দিকে বৃষ্টির দাপটের পর ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকার পর আবারও বৃষ্টিতে কমবে তাপমাত্রা। আর মাসের শেষার্ধে হয়তো বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং তা থেকে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতেও পারে। আর তা হলে তখন বৃষ্টির মাত্রা বাড়বে। এতে স্বাভাবিকভাবেই মে মাসে টানা গরমের তীব্রতা কম থাকতে পারে।

অপরদিকে এবার তুলনামূলকভাবে বৃষ্টি বেশি হবে উল্লেখ করে আবহাওয়া অফিসের ফোরকাস্টিং কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, মে মাস দেশের উষ্ণতম মাসগুলোর একটি। এপ্রিলের পরেই এ মাসে বেশি গরম অনুভূত হয়। কিন্তু এবার এমন আবহাওয়া দেখা যাওয়ার লক্ষণ কম। মাসের প্রথমার্ধে এপ্রিলের মতো থেমে থেমে কালবৈশাখী ও বৃষ্টিপাত হবে। এতে গরমের মাত্রা কমে আসবে।

আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মে মাসে দেশের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা থাকার কথা ৩২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ১৯৬১ সালের ২৯ মে ফরিদপুরে ৪৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া ১৯৫৯ সালের ২০ মে দিনাজপুরে ৪৩ দশমিক ৭, ১৯৬৮ সালের ৯ মে ময়মনসিংহে ৪৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০২৪ সালের ১ মে যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল। গত বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল কুষ্টিয়ায় ১০ মে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মে মাসের তাপমাত্রার বিষয়ে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেসা বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে দেশের ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। এতে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রার পারদ বেড়ে যায়। কিন্তু এবার এপ্রিলে যেমন কালবৈশাখীর প্রভাবে ঘন ঘন বৃষ্টি হয়েছে তাই তাপমাত্রার পারদ তেমন বাড়তে পারেনি। তেমনিভাবে মে মাসেও বৃষ্টিপাতের প্রভাবে তাপপ্রবাহ বাড়তে পারবে না।

আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাসের প্রথমার্ধ-জুড়ে থাকবে বৃষ্টি। এই বৃষ্টির পর তাপমাত্রার পারদ একটু বাড়তে থাকবে। পরবর্তী সময়ে ২২ তারিখের পর মৌসুমি বাতাস প্রবেশের আবহ তৈরি হবে এবং তখন বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টির পাশাপাশি বৃষ্টিপাতে কমে আসবে গরমের তীব্রতা।

গরম কেন কম পড়বে

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, বছরের এই সময়ে পশ্চিমা লঘুচাপ সাধারণত নেপালের ওপর দিয়ে পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু এবার তা একটু নিচ দিয়ে নেমে ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো এবং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা পুবালী বাতাস ও পশ্চিমা লঘুচাপের মিলনের কারণে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আর এই বৃষ্টি বেশি হচ্ছে ভারতের আসাম, বিহার ও মেঘালয় রাজ্যগুলোতে। এর প্রভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ইতিমধ্যে বন্যা শুরু হয়ে গেছে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ড. সমরেন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘মাসের প্রথমার্ধে বৃষ্টিপাতের প্রভাব থাকলেও মাসের মধ্যমার্ধে কিন্তু গরম কিছুটা বাড়বে। তবে ২০ বা ২২ মে তারিখের পর আবারও গরম কমতে শুরু করবে।

এদিকে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশ করে থাকে। ভারত মহাসাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর দিয়ে জলীয় বাষ্প নিয়ে প্রবেশ করা এই বায়ুর প্রভাবে দেশে বর্ষাকাল শুরু হয়ে থাকে। এই বৃষ্টির প্রভাবে গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ কমে গিয়ে বর্ষার সূচনা হয় বলে আবহাওয়াবিদরা জানান।

এ বিষয়ে কথা হয় সাউথ এশিয়ান মিটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর ইতিমধ্যে এবার দেশের পূর্বাংশে ১০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। অপরদিকে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে পশ্চিমা লঘুচাপ ও পুবালী লঘুচাপের কারণে থেমে থেমে কালবৈশাখী ও বৃষ্টি হবে। এতে টানা গরমের তীব্রতা কমে আসবে। উল্লেখ্য, কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে মৃদু তাপপ্রবাহ, ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে মাঝারি ও ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আর ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হয়ে থাকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত