ছোট গোলন্দাজের বড় প্লটের লোভ

আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ০৮:১২ এএম

মাত্র ২২০ ভরি স্বর্ণালংকার আছে ফাহ্মী গোলন্দাজ বাবেলের। আর তার স্ত্রী শারমিন গোলন্দাজের আছে ৫০০ ভরি। নিজের অলংকারগুলো বিয়ের সময়ের, এমন দাবি বাবেল করলেও স্ত্রীর গহনার উৎস কী, তা এড়িয়ে গেছেন ময়মনসিংহ-১০ আসনে তিনবার নির্বাচিত সাবেক এই সংসদ সদস্য (এমপি)।

পৈতৃক ও নিজে কেনা সূত্রে ময়মনসিংহ শহর, ভালুকা ও গফরগাঁও এবং নারায়ণগঞ্জে বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমি, চা বাগান, রাবার বাগান, মাছের খামার ও দালান আছে তাদের। আর ঢাকার ধানম-ি ও গুলশানে আছে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট! রাজধানীর নিকুঞ্জে প্লট থাকার তথ্য মেলে। সেই সঙ্গে নিজেদের হিসাবে দেখানো সম্পদ, ব্যবসার আয়, ব্যাংকে ও নগদে থাকা কোটি কোটি টাকাসহ সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে অন্তত ১০০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তাদের। অথচ ধনী এই ‘জনপ্রতিনিধি’ লোভ সামলাতে পারেননি রাজধানীর পূর্বাচলে রাজউকের একটি বড় প্লটের।

পিতা সাবেক এমপি আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের তিন সন্তানের মধ্যে সম্ভবত দ্বিতীয় এই ফাহ্মী গোলন্দাজ, যিনি বাবেল হিসেবে পরিচিত। পিতার আসনেই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনি পরপর তিন বার এমপি ‘নির্বাচিত’ হন।

এত সম্পদ থাকার পরও তিনি ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার এমপি হয়ে সরকারি প্লটের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী রাজউক ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট পূর্বাচলে ২৯ নম্বর সেক্টরে ৩০৮ নম্বর সড়কে ২৯ নম্বর প্লটটি তাকে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু তিন কাঠার প্লট বরাদ্দ হওয়ায় অসন্তুষ্ট হন এই ‘জনপ্রতিনিধি’। এরপর বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে তিন কাঠার জায়গায় ১০ কাঠার একটি প্লট বরাদ্দের জন্য তিনি মন্ত্রণালয়ে আরেকটি পত্র দেন। সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, যিনি ময়মনসিংহেরই আরেকটি আসন থেকে নির্বাচিত এমপি ছিলেন, আবেদন অনুযায়ী ফাহ্মী গোলন্দাজকে এবার ১০ কাঠার প্লট দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নিতে রাজউককে নির্দেশ দেন।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাসহ তাদের পরিবারের ছয়জনের নামে ১০ কাঠা করে ছয়টি প্লট (মোট ৬০ কাঠা) নেওয়ার অভিযোগে ছয়টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাগুলোর তদন্তকালে সাবেক এমপি ফাহ্মী গোলন্দাজের অবৈধ উপায়ে রাজউকের প্লট গ্রহণ বিষয়টি দুদকের নজরে আসে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ফাহ্মী গোলন্দাজ রাজউকের নির্মিত দুটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন। তিনি একটি সরকারি প্লটও নিয়েছেন। রাজউক বিধি অনুযায়ী রাজউকের প্লট পেতে হলে আবেদনের সময় রাজউক বা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো প্লট-ফ্ল্যাট পাননি মর্মে হলফনামা দাখিল করতে হয়। কিন্তু একাধিক প্লট-ফ্ল্যাট থাকায় রাজউকের বরাদ্দ পেতে তিনি কী অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন, সেটি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ফাহ্মী গোলন্দাজ মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যে হলফনামা জমা দেন, তাতে দেখা যায়, রাজধানীর নিকুঞ্জেও জমি আছে তাদের। আর রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে ৪ কাঠার একটি প্লটের উল্লেখ আছে তাতে। বাস্তবে পূর্বাচলে ৪ কাঠা আয়তনের কোনো প্লট থাকার কথা নয়। 

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ফাহ্মী গোলন্দাজ ও তার স্ত্রী শারমিন গোলন্দাজের অর্জিত সম্পদের মূল্য ২৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু তাদের দুজনের গ্রহণযোগ্য মোট আয় সাড়ে ৪ কোটি টাকার বেশি নয়। সেই হিসাবে, তাদের জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ২১ কোটির বেশি টাকার সম্পদ রয়েছে।  

দুদকের অপর একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদক যখন মামলা করে তখন দলিলমূল্য দেখে এজাহার করে। বাস্তবে তাদের সম্পদের বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এত সম্পদ থাকার পরও রাজউকের প্লটের প্রতি ফাহ্মীর লোভ ছিল। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রথমে তিন কাঠার প্লট নিয়েছেন। পরে আবার প্রভাব খাটিয়ে তিন কাঠার প্লটের পরিবর্তে ১০ কাঠার প্লট চেয়েছেন। কোনো পাবলিক সার্ভেন্টের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেলে অনুসন্ধান করে দুদক। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পেলে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি ফাহ্মী গোলন্দাজ ও তার স্ত্রী বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থপাচার ও ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্ত্রীকে অবৈধ সম্পদ অর্জনে সহায়তা করার অপরাধের মামলায়ও ফাহ্মী গোলন্দাজকে আসামি করা হয়।

এখন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি প্লট গ্রহণের অভিযোগটি অনুসন্ধান করা হবে। ইতিমধ্যে তার প্লটের তথ্য চেয়ে রাজউকে চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ফাহ্মী গোলন্দাজ মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যে হলফনামা জমা দেন, তাতে এই দম্পতির যে ৭২০ ভরি স্বর্ণালংকার থাকার কথা বলা আছে, তার বর্তমান বাজারমূল্য ১৭ কোটি ৭৭ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।

দুদকের অনুসন্ধানকালে ফাহ্মীর বিয়েতে কাদের দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল, তাদের নাম-ঠিকানা অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায় স্বর্ণালংকার উপহার পাওয়ার বিষয়টি মিথ্যা। কর্মকর্তারা মনে করছেন, নিজের অবৈধ আয়কে বৈধ দেখাতে অনেকে অনেক স্বর্ণালংকার আয়কর নথিতে দেখান। এক্ষেত্রেও তাই ঘটে থাকতে পারে।

আয়কর নথি অনুযায়ী, ফাহ্মী গোলন্দাজের নগদ অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬৮ হাজার ১২২ টাকা ও স্ত্রীর ১০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ব্যাংকে তার জমা ১১ কোটি ৯২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৯ টাকা ও স্ত্রীর ১ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ১৪৫ টাকা। এছাড়া, গোলন্দাজের ব্যক্তিগত দুটো জিপ রয়েছে, যার মূল্য ১ কোটি ১০ লাখ টাকা।

নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তার স্ত্রীর একটি দোতলা বাড়ি ও পৈতৃক সূত্রে ৮টি ফ্ল্যাট আছে। 

এছাড়া ফাহ্মী গোলন্দাজের একটি পিস্তল ও একটি শটগান এবং তার স্ত্রী শারমিন গোলন্দাজের একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল রয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর ফাহ্মী গোলন্দাজ দম্পতির বছরে মোট আয় ৩ কোটি ৩২ লাখ ২২ হাজার ৮৩২ টাকা। কৃষি, বাড়ি ও দোকান ভাড়া, ব্যবসা ও ব্যাংকের সুদ থেকে এসব আয় আসে। এর বাইরে ফাহ্মী গোলন্দাজ চাঁদাবাজি, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমেও বিপুল অর্থ আয় করেন বলে অভিযোগ আছে।

দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ফাহ্মী গোলন্দাজের ধানমন্ডির যে ফ্ল্যাট ১ কোটি ৪ লাখ টাকায় কেনা দেখানো হয়েছে, পার্কিং বাদ দিলে তার প্রতি বর্গফুটের দাম দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ টাকা। বাস্তবে ধানমন্ডিতে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ফ্ল্যাটটির দাম ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। একইভাবে, গুলশানের ফ্ল্যাটের দাম ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে ফাহ্মী গোলন্দাজ ও তার পরিবার আত্মগোপনে রয়েছেন। এ কারণে অভিযোগের বিষয়ে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ফাহ্মী গোলন্দাজের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত