সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসক বা ডিসি (ডেপুটি কমিশনার) সম্মেলনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন ‘সুশাসনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং অবশ্যই জবাবদিহিতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার। সেটি হলো, আমরা কম্প্রোমাইজ করতে চাই না দুর্নীতির সঙ্গে।’ পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’র প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের উদ্দেশে বলেন ‘জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সব পদেই কাজ করার মানসিকতা থাকা জরুরি।’ সম্মেলনে বাজার সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম সংকট রোধে ডিসিদের কঠোর হওয়ারও নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। চার দিনের এ সম্মেলন চলবে আগামী বুধবার পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল সোয়া ১০টার পর সচিবালয়ের দপ্তর থেকে হেঁটে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি শক্তিশালী জবাবদিহিমূলক, আইনসম্মত এবং জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনারাই হচ্ছেন সরকারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সুশাসনকে বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি আমরা করতে চাইছি।’
নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল রোধ, সিন্ডিকেট ভাঙতে, দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) দায়িত্ব পালনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে বলেন তিনি। জনপ্রশাসনে পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পদোন্নতি কিংবা পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতাই জনপ্রশাসনকে দুর্নীতিপরায়ণ এবং অপেশাদার করে তোলার অন্যতম কারণ।’
তিনি বলেন, ‘পদোন্নতি বা পছন্দের পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারত্বের সঙ্গে আপস করলে তা জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যেকোনো সময় দেশের যেকোনো স্থানে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনে নিয়োগ, বদলি কিংবা পদায়নের মূলনীতি।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন ‘জনগণের সামনে প্রমাণিত হয়েছে, প্রশাসনের পক্ষে জনরায়ের প্রতিফলন ঘটে, এমন সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রমাণিত হয়েছে, জনপ্রশাসনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা না করাও সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি ও লুটপাট রাষ্ট্রকে ঋণগ্রস্ত করে ফেলেছে। ৩০ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। তবে আমরা অবস্থার পরিবর্তন করছি।’
সরকারের জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দলমত-নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনাই সরকারের লক্ষ্য। সরকার ইতোমধ্যেই কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড ও স্পোর্টস কার্ড দেওয়া শুরু করেছে। ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ অন্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদেরও সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত মানুষের কাছে এসব কার্ড সফলভাবে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ডিসিদের পালন করতে হবে।’
দেশকে বন্যা ও খরা থেকে বাঁচাতে এবং পুনরায় কৃষি বিপ্লব ঘটাতে এক্সকাভেটরের বদলে জনগণের সম্পৃক্ততায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং পাহাড় বা বনভূমি রক্ষায় জেলা প্রশাসকদের কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ডিসিদের কড়া নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইচ্ছেমতো যাতে কেউ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়াতে না পারে কিংবা মজুদদারি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান করতে হবে। খাদ্যে ভেজাল, মাদক, বাল্যবিবাহ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি কার্যালয়ে সেবাপ্রার্থীরা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।’
নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের সামনে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’র প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে টিকে থাকতে জনপ্রশাসনকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সময়োপযোগী হতে হবে।’
দেশকে বৈষম্যমুক্ত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন “আমরা একটি প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক ও নৈতিক রাষ্ট্র গড়তে চাই; যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য থাকবে না। আমাদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।”
সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি প্রমুখ।
সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও আওতাধীন সংস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং আইন মন্ত্রণালয় বিষয়ে আলোচনা হয়। অধিবেশন শেষে ডিসিরা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
ডিসি সম্মেলনে যা যা থাকছে : চার দিনব্যাপী সম্মেলনে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সম্মেলনে মোট অধিবেশন থাকছে ৩৪টি। এর মধ্যে কার্য অধিবেশন ৩০টি এবং অংশগ্রহণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সংখ্যা হচ্ছে ৫৬টি। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের ৪৯৮টি প্রস্তাব সম্মেলনে উত্থাপিত হবে। ৫৬টি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সম্মেলনে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে এবারের ডিসি সম্মেলনের ব্যয় বরাদ্দ কমানো হয়েছে। গত বছর ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, খরচ হয় ১ কোটি ২ লাখ টাকা। এবার বাজেট ধরা হয়েছে ৭১ লাখ টাকা।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে আজ সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ-সম্পর্কিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিনে জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন ডিসিরা।
তৃতীয় দিন মঙ্গলবার সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কে আলোচনা হবে। একই দিনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ডিসিরা। এদিন নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনার কথা রয়েছে।
সম্মেলনের শেষ দিন বুধবার স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এদিন রাতে রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা অনুষ্ঠিত হবে। এই সভায় ডিসিসহ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন।
