টানা দেড় মাস ধরে ম্যারাথন ভোটপর্ব শেষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে আজ সোমবার। কারণ আজই সবাই নিশ্চিতভাবে জেনে যাবে শেষ হাসি কে হাসতে চলেছেন মোদি না দিদি। তৃণমূল কংগ্রেস টানা চতুর্থবারের মতো রাজ্যের ক্ষমতায় থাকছেন, নাকি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি।
ফলাফল ঘিরে রাজ্যের সব জায়গায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস উভয়ই।
যদিও বুথফেরত সমীক্ষাগুলো দিয়েছে মিশ্র বার্তা। ভারতে কোনো নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া আর ভোট গণনা শুরুর মধ্যে যে ব্যবধানটা থাকে, সেই সময়ে যথারীতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ আর চর্চা থাকে ‘এক্সিট পোল’ বা বুথফেরত সমীক্ষা নিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এবারে যে কয়েকটি এক্সিট পোলের ফল সামনে এসেছে, তার প্রায় সবগুলোতেই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান খুব কম থাকবে বলে পূর্বাভাস করা হয়েছে এবং গরিষ্ঠতা পেলেও কোনো দলই খুব বিরাট ব্যবধানে জিতবে না বলেও এক্সিট পোলগুলো থেকে ইঙ্গিত মিলছে।
এর ফলে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে জল্পনা যথারীতি আরও বেড়েছে এবং অনেকেই ধারণা করছেন, পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটে প্রধান প্রতিপক্ষ দুই দলের মধ্যে খুব ‘হাড্ডাহাড্ডি’ একটা লড়াই হবে।
গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বরাবর প্রায় ‘একপেশে’ ফলাফল দেখে এসেছে। মানে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট বা তৃণমূল কংগ্রেস যখন যারাই জিতেছে তারাই বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে জিতেছে। ফলে এক্সিট পোলের ইঙ্গিত অনুযায়ী সত্যিই শেষ পর্যন্ত জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে সেটা হবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য অতি বিরল একটা ঘটনা।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকছেই। কারণ এক্সিট পোলের ফল কখানোই পুরোটা বিশ্বাসযোগ্য নয়, এমনটা হতেই পারে যে, কোনো একটি দল ২০০ বা তারও বেশি সংখ্যক আসন পেয়ে অনায়াসে সরকার গড়ে ফেলল।
প্রধান দুটি দলের সর্বোচ্চ নেতা-নেত্রী, তাদের প্রার্থী ও রাজনীতিবিদরা, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবারের ভোটে এমন অনেক করেছেন বা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা এই ভোটকে একেবারেই অন্যরকম মাত্রা দিয়েছে।
গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনে ভোট নেওয়া হয়। প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিল ১৬ জেলার ১৫২ আসনে এবং দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিল কলকাতাসহ সাতটি জেলার ১৪২টি আসনে ভোট নেওয়া হয়। এবারের প্রথম দফা নির্বাচনে ১৫২ আসনে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৪৭৮ জন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ১৬৭ জন। দ্বিতীয় দফার ১৪২ আসনে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৪৪৮ জন। তাদের মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন ২২০ জন। আগামীকাল ভাগ্য নির্ধারিত হবে এসব প্রার্থীর।
স্থানীয় সময় আজ সকাল ৮টায় শুরু হবে ভোট গণনা। প্রথমে গোনা হবে পোস্টাল ব্যালট। তারপর খোলা হবে ইভিএম। ২০২১ সালে রাজ্যের জেলায় জেলায় মোট ১০৮টি কেন্দ্রে গণনা হয়েছিল। এবার নির্বাচন কমিশন গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা কমিয়ে ৭৭ করেছে। কলকাতায় নির্বাচনী কেন্দ্র রয়েছে ১১টি। সেগুলোর গণনা হবে পাঁচটি কেন্দ্রে। রায়বন্দি ইভিএমগুলো ভোট শেষ হওয়ার পর প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে ‘সিল’ করা হয়েছে। রাখা হয়েছে বিভিন্ন এলাকায় স্ট্রং রুমে। চার দিন ধরে যুযুধান দুই রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির নেতাকর্মীরা পালা করে স্ট্রং রুম পাহারা দিচ্ছেন। পাহারায় আছে কেন্দ্রীয় বাহিনীও। গণনা নিয়ে দুই পক্ষই কর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে রেখেছে। গত শনিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভার্চুয়াল বৈঠকে গণনাকেন্দ্রে কর্মীদের ইতিকর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, শাসকের এজেন্টরা ভোট লুটের চেষ্টায় খামতি রাখবেন না। কিন্তু একটি ভোটও চুরি হতে দেওয়া যাবে না।
রেকর্ড ভোট প্রদান : পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনে দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে কোনো দিন কোনো নির্বাচনে এত বেশি হারে ভোট পড়েনি। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য বরাবরই অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় বেশি ভোট পড়ে, কিন্তু শহর-গ্রামাঞ্চল নির্বিশেষে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি ভোট পড়া ওই রাজ্যের জন্যও একটি নজিরবিহীন ঘটনা।
জাতীয় নির্বাচন কমিশন তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এর আগে (শতাংশের হিসেবে) সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছিল ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, আর তা ছিল ৮৪.৭২ শতাংশ। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙেছে। অনেকেই অবশ্য এত বেশি ভোটদানের হারের সঙ্গে ভোটার তালিকার ‘নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআরের সম্পর্ক টানছেন।
