বগুড়ায় ৬৪ মাসে খুন ৪৩০, চলতি বছরে ৩০

আপডেট : ০৪ মে ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

বগুড়া জেলা ক্রমেই খুনের নগরীর দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ৬৪ মাসে এ জেলায় ৪৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই খুন হয়েছে ৩০টি। আর ২০২৫ সালে মোট খুনের ঘটনা ছিল ৫৭টি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বগুড়ায় খুন হয়েছে ৯৫টি। সে হিসাবে ২০২৫ সালে খুনের ঘটনা ৩৮টি কমেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ৭৭টি, ২০২২ সালে ৮৯টি এবং ২০২১ সালে ৮২টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। গত পাঁচ বছরে মোট খুনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০০টি। চলতি বছরের চার মাসে আরও ৩০টি যোগ হয়ে ৬৪ মাসে মোট ৪৩০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বগুড়ায় খুনের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৩০টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে তুচ্ছ ঘটনা, সামাজিক আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও পারিবারিক কলহসহ নানা কারণ রয়েছে। এতে জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬টি, মার্চে ১০টি এবং এপ্রিলে ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৫ সালে বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলায় মোট ৫৭টি খুন সংঘটিত হয়। এর মধ্যে বগুড়া সদর থানায় ১৪টি, শাজাহানপুরে ৭টি, শিবগঞ্জে ৪টি, সোনাতলায় ২টি, গাবতলীতে ৪টি, সারিয়াকান্দিতে ৩টি, আদমদিঘীতে ২টি, দুপচাঁচিয়ায় ৪টি, নন্দীগ্রামে ৪টি, কাহালুতে ৩টি, শেরপুরে ৭টি এবং ধুনটে ৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটে।

বছরজুড়ে জেলায় বেশ কিছু আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে গত ২৮ মার্চ ফতেহ আলী বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী আলাল শেখকে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে শহরের সেউজগাড়ি ডাবতলা এলাকায় নির্মমভাবে হামলা চালায়। হাতুড়ি দিয়ে তার হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। পরে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ এপ্রিল ভোরে তিনি মারা যান।

৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় শিবগঞ্জ উপজেলার ময়দানহাটা ইউনিয়নের মহব্বত নন্দীপুর এলাকায় নিজ বাড়িতে খুন হন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শাহানাজ বেগম (৭০)। দুর্বৃত্তরা বাড়িতে ঢুকে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। পরদিন ৬ এপ্রিল সকালে মোকামতলা ইউনিয়নের জাবারীপুর গ্রামে প্রতিপক্ষের হামলায় মোমেনা বেগম (৬৮) নিহত হন।

এ ছাড়া ১ মার্চ বগুড়া সদর উপজেলার সাবগ্রামে ঘরে ঢুকে আনোয়ারা বেগম (৫৮) ও তার মেয়ে সকিনাকে (৩৫) হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

১৫ জুন স্কুলছাত্রী মেয়েকে বিয়ে করতে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে শাকিল আহমেদকে (৪০) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ১৬ জুলাই ইসলামপুর হরিগাড়ী এলাকায় রাতে বাড়িতে ঢুকে দুজন নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় এবং একজন আহত হন। পরে ডিবি পুলিশ প্রধান অভিযুক্তকে আটক করে।

১৬ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জে কুয়েত প্রবাসীর স্ত্রী রানী বেগম ও ছেলে ইমরান হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশের অভিযানে নিহতের ভাইসহ সহযোগীদের আটক করা হয়। ২৮ অক্টোবর শহরের সেউজগাড়ী এলাকায় হাবিবুর রহমান খোকনকে (৩৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং আরেকজন আহত হন।

২৫ নভেম্বর শাজাহানপুরে ছুটিতে বাড়ি আসা এক সেনাসদস্যের বাসা থেকে তার দুই সন্তানের গলাকাটা লাশ এবং স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় স্বামীকে আটক করে পুলিশ।

বগুড়ার বিশিষ্ট আইনজীবী গোলাম মোস্তফা জিয়ন বলেন, ‘বর্তমানে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পুলিশের কার্যক্রম কমে যাওয়ায় অপরাধীরা বিচারহীনতার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে মানুষ এখন দিন-রাত সব সময়ই অনিরাপদ বোধ করছে।’ 

সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘খুনের ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করছে। অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া মুখপাত্র আতোয়ার রহমান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। শুধু পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে একা এসব অপরাধ দমন সম্ভব নয়। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে এবং প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত