পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন

যে কারণে ভূমিধস জয় বিজেপির

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৪:৪৮ এএম

টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার পর বড় পরাজয়ের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের পথে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এর মাধ্যমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে এক যুগেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যেতে চলেছে। 

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনে বিজেপির জয় শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং রাজ্যের ভোটারদের মানসিকতা ও অগ্রাধিকারের বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং বিরোধীদের দুর্বলতা-সব মিলিয়ে এই ভূমিধস জয় সম্ভব হয়েছে। এই ফলাফল ভবিষ্যতে ভারতের আঞ্চলিক রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য মতে, বিজেপি ২০৬টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে। অর্থাৎ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮ আসনের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত করছে দলটি। অন্যদিকে বর্তমানে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস পাচ্ছে ৮১টি আসন। অন্যান্য দল মিলে ছয়টি। এক দশক ধরে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি ২০২১ সালের নির্বাচনেই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার আশা করেছিল। সেবার পদ্ম না ফুটলেও বিধানসভায় আসনসংখ্যা ৩ থেকে ৭৭-এ গিয়েছিল। এবার তাদের প্রত্যাশা ছিল ১৮৫টির বেশি আসন। সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাচ্ছে দলটি। বিশাল এই জয়ের পেছনে দলটি পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে।

প্রথমত কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স তথা এনডিএ সরকারের নারী সংরক্ষণ বিলের উদ্যোগ নারী ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিরোধী দলগুলো ‘নারীবিরোধী’-বিজেপির এমন প্রচার সাধারণ মানুষের মনে সাড়া ফেলেছে। বিজেপির অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যে বিজেপির পক্ষে নারী ভোট অন্তত ৫ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান।

এছাড়া বিজেপি সরকারি কর্মচারীদের ‘অধিকার হরণের’ অভিযোগ ঘিরে থাকা ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েছে। ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর এবং শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি সরকারি কর্মচারী ও চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করেছে।এটা প্রায় ২০ থেকে ৫০ লাখ ভোটারের ওপর প্রভাব ফেলেছে। উল্লেখ্য, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিজীবী ভোটারের সংখ্যা বেশি। নির্বাচনে অংশ নেয়া রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই ‘সার্ভিস ভোটার’ (যেমন সেনা বা সরকারি দায়িত্বে বাইরে থাকা ভোটার) সবচেয়ে বেশি ছিল। পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১.০৮ লাখ। তুলনায় তামিলনাড়ুতে ছিল ৬৭ হাজারের কিছু বেশি, আসামে ৬৩ হাজারের বেশি। আর কেরালাতে ছিল প্রায় ৫৪ হাজারের একটু বেশি।

‘মোদি বনাম মমতা’ প্রচারই এবারের নির্বাচনে বাজিমাত করেছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়া এবং পরিকাঠামোর অভাবকে হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক ডজনের বেশি জনসভার প্রতিশ্রুতি মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের (২০-২৯ বছর বয়সি ১.৩১ কোটি ভোটার) ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে।
 
দলীয় সূত্রের মতে, কেন্দ্র সরকারের উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্প এবং মোদির একের পর এক জনসভায় দেয়া আশ্বাস—এই দুটো বিষয় মধ্যবিত্ত ও নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ৫.২৩ লাখ নতুন ভোটার প্রথমবারের মতো ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এছাড়া ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সি ভোটার ছিল প্রায় ১.৩১ কোটি। এই তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করেই বিজেপি বিশেষ প্রচারণা চালায়—সোশ্যাল মিডিয়া এবং মাঠপর্যায়ে উভয় জায়গাতেই।

রাজনৈতিক হিংসাপ্রবণ এই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন সাধারণ ভোটারদের মনে সাহস জুগিয়েছে। তাছাড়া আরজি কর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডসহ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র প্রচার ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে বড় প্রভাব ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নিরলস প্রচারও ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আরো রয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন ও বহিরাগত ইস্যু। ভোটার তালিকা থেকে ‘বহিরাগত’ বা ভুয়া ভোটারদের বাদ দেয়ার ক্ষেত্রে বিজেপি সফল হয়েছিল। কথিত ‘যৌক্তিক অসংগতি’র ভিত্তিতে তালিকা থেকে ২৭ লাখের বেশি নাম বাদ দেয়া পড়ে। ভোটার তালিকা ‘স্বচ্ছ’ করতে বিজেপির এই প্রচার ভোটেও প্রভাব ফেলেছে।


 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত