আজ শাপলা চত্বর সহিংসতা দিবস

রাজনীতির চক্করে হেফাজতের মামলা

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৭:৪৭ এএম

২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ও ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় সারা দেশে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৮৩টি মামলা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এসব মামলায় হেফাজতের তিন হাজার ৪১৬ নেতার নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। মামলাগুলোর মধ্যে ২৫টির অভিযোগপত্র ও দুইটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হলেও ৫৬টি মামলার তদন্ত শেষই হয়নি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতায় ঝুলে আছে এসব মামলার ভবিষ্যৎ। আওয়ামী লীগ সরকার মামলাগুলো সামনে রেখে হেফাজত নেতাদের অনেকটা জিম্মি করে ফায়দা লুটেছে। এ নিয়ে একাধিকবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেছেন হেফাজত নেতারা। বারবার আশ্বাস মিললেও কোনো কাজ হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ ছিল। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু হেফাজতের মামলার সুরাহা হয় না। এখন হেফাজত নেতারা তাকিয়ে আছেন বিএনপি সরকারের দিকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হেফাজত নেতারা মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার আশা করলেও অন্তর্বর্তী সরকারও একই আচরণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও কাজ হয়নি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার তদন্ত আগের মতোই ’আঁতুড়ঘরে’ পড়ে আছে। মামলা প্রত্যাহার, অভিযোগপত্র বা তদন্তের জন্য ‘ইউটার্নে’ নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্তারা। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতায় ঝুলে আছে তদন্তের অগ্রগতি। এ ছাড়া রাজনৈতিক চক্করেই থাকছেন আসামিরা। হেফাজত নেতারাও বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণেই মামলার তদন্ত হচ্ছে না। 

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের উচ্চমহল থেকে মামলা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত মিললেও কাজ হচ্ছে না। মামলাগুলো নিয়ে অতীতে আমাদেরই কিছু কর্মকর্তা নানা ধরনের নাটক করেছেন। তারা তৎকালীন সরকারকে খুশি করতে এসব মামলা করে হেফাজতের নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করেছেন। তবে এখন যেকোনো হয়রানি করা থেকে পুলিশ বিরত থাকলেও তদন্ত নেই বললেই চলে। সরকারের হাইকমান্ড থেকে বিশেষ কোনো বার্তা আসেনি। 

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আগের তদন্ত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট থানায় না থাকায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তদন্ত কর্মকর্তারা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আবার অনেকেই জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যার মামলার আসামি হয়েছেন। কেউ কেউ আটকও হয়েছেন। সব মিলিয়ে স্থবির হয়ে আছে তদন্তকার্যক্রম। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও মামলাগুলো প্রত্যাহার বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উদ্যোগে ভাটা পড়েছে।

হেফাজতে ইসলামের দাবি, একসময় তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে হাসিনা সরকার। তখন মামলা ছিল যেন জিম্মি করার হাতিয়ার। ওই সময় দেনদরবার করেও মামলা থেকে রেহাই মেলেনি তাদের। উল্টা আওয়ামী লীগ সরকারকে সহায়তা করতে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হতো। তদন্তের নামে ঝুলিয়ে রাখা হয় মামলা নামের ‘আতঙ্ক’।

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্তর্র্র্বর্তী সরকারকে অনুরোধ করেছিলাম হেফাজতের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো সুরাহা করতে। আশ্বাসও দিয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। বর্তমান সরকার কী করবে তা জানি না। এসব মামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সঙ্গে অভিনয় করেছে। তারা মামলাগুলো প্রত্যাহারের কথা বললেও তা করেনি।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা বদলি হয়ে গেছেন। ফলে নতুন করে তদন্ত কর্মকর্তা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও মামলাগুলোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। আমরা নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। হেফাজতের মামলাগুলো ছিল রাজনৈতিক। আওয়ামী লীগ সরকার এসব মামলা তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে হেফাজতকে চাপে রেখেছিল। 

হেফাজতের এক নেতাও একই কথা বলেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেন মামলাগুলো প্রত্যাহার হচ্ছে না তা বুঝতে পারছি না। মামলাগুলোতো রাজনৈতিক। আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের নেতাকর্মীদের হত্যা করে উল্টা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়, সেগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। বর্তমান সরকার মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দিয়েছে। আমরা সরকারের হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আরও বলেন, সরকার আওয়ামী লীগ আমলে দায়ের করা রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিলেও আমাদের মামলাগুলো কবে নিষ্পত্তি হবে তা বুঝতে পারছি না। দ্রুত মামলাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুরনো মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করার চেষ্টা চলছে। মামলাগুলোর তদন্তে ছিল ডিবি, সিআইডি, পিবিআই ও থানা পুলিশ। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকাসহ সাতটি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। তার মধ্যে বাগেরহাটের একটি মামলার বিচার শেষ হলেও রায়ে সব আসামি খালাস পেয়েছেন। দুটি মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ। ১৮টি মামলার অভিযোগপত্র দিলেও এর বিচার প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। হেফাজত ছাড়াও ইসলামী ঐক্যজোট, জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছিল। মামলাগুলোর বেশিরভাগ আসামিই জামিনে আছেন।

ব্লগারদের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননা ও নারীনীতির বিরোধিতাসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম। এতে লাখো কওমি আলেম শিক্ষার্থী ও সাধারণ মুসলমান অংশ নেন। সমাবেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সেই রাতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে মতিঝিল থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয়। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় অভিযোগ দাখিল করেছিলেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে করা এ অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

এদিকে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ঘটনাস্থলেই ৩২ জন নিহতের তথ্য পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। গত রবিবার এ তথ্য জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। এ মামলায় আগামী ৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে দাখিল করা হবে। শাপলা চত্বর হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। এখন পর্যন্ত ৯০ শতাংশ তদন্ত শেষ হয়েছে। চট্টগ্রামে একটি মামলার তদন্তের কাজ বাকি রয়েছে। এই তদন্ত শেষ হলে প্রতিবেদন দাখিল সম্ভব হবে। এই ঘটনায় জড়িত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক মোল্লা নজরুল ইসলাম কারাগারে আছেন। গত বছরের ১২ মার্চ এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত