হারানো মায়ের খোঁজে ৭ বছর ধরে পথেপথে হাঁটছেন সুমন মিয়া। রঙিন পাখা, পাখির বাঁশি, চরকি, গুনজনি আর শিশুদের নানা খেলনা নিয়ে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তিনি ছুঁটছেন।
৫-৬ বছর বয়সেই রাজধানী ঢাকার রাস্তায় সুমন মাকে হারিয়ে ফেলেন। যাত্রাবাড়ী এলাকায় এক বস্তিতেই থাকতো ওরা। তার মা বস্তিবাসীর কাছে রোজি নামেই পরিচিত ছিল।
‘মাকে খুঁজে পেতে, বড়বড় হেডলাইন করে’ গলায় ঝুলিয়ে ঢাকার অলিগলিতে ঘুরেছেন সুমন। কিন্তু কে তার মা, কে তার বাবা! সেই পরিচয়টুকু জানতে আজও হাঁটছেন তিনি। মাকে হারিয়ে কিছুদিন তার ঢাকার শিশুপার্ক, উদ্যানে কেটেছে। এরপর তাকে যাত্রাবাড়ির এক এতিমখানায় ভর্তি করা হয়। সেখানেই চলে তার জীবন। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় যাত্রাবাড়ি এতিমখানার ঠিকানা ছেড়ে আবারও ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে জংশন, জাতীয় স্টেডিয়াম এসব এলাকায় ঠাঁই নেন ভবঘুরে এ সুমন। তখন ‘মা ফিরে এসো, মাকে খোঁজে দাও’ বড় বড় অক্ষরে সাইনবোর্ড বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে মাকে খোঁজেন সুমন।
সুমন জানান, আমি ৩ বছর ধরে গৌরীপুর জংশনে থাকি। আমার মায়ের সঠিক বর্ণনা মনে নেই, দেখতে আমার মতোই শ্যামলা বর্ণের ছিল। অনেকেই রোজি রোজি বলে ডাকতো। আসল নামটাও জানা নেই।
তিনি জানান, আমি আমার মায়ের ডাক শুনতে পাই। প্রায় মা আমাকে ডাকেন। আমি একাকি বসে থাকলে মায়ের স্পর্শও পাই। আমার মা বেঁচে আছেন, অবশ্যই মাকে খুঁজে পাবো। এই চরকি দেখছেন, এটা যেমন ঘুরে আমি দেশজুড়ে ঘুরছি। মাকে খুঁজে পেতেই ফেরিওয়ালা হয়েছি। এতে যা আয় হয়, তা দিয়ে জীবন চলছে। আমার বয়স এখন ২৫ বছর। যেদিন এতিমখানা থেকে বের হলাম, সেদিন থেকেই মাকে খুঁজছি।
সুমন আরও জানান, তিনি এই পাখা ৮ টাকা করে কিনেছেন, ২০-৩০ টাকায় বিক্রি করেন। আর এ পাখির বাঁশিগুলো ৪-৫টাকা কেনা। বিক্রি করেন ১০-১৫টাকা। গুনজনি কিনেছেন ৪ টাকায়, বিক্রি করেন ১০ টাকায়। পাখির বাসাগুলো ১৫ টাকা কেনা, বিক্রি করেন ৩০-৪০ টাকায়। এতে তার যা আয় হয়, তা দিয়েই জীবন চলে।
তিনি আরও জানান, এতিমখানা থেকে বের হয়ে প্রথমে গার্মেন্টে চাকুরি নেন। সেখানেও বেতন পেতে নানা ঝামেলা হতো। টাকা দিয়ে কি করবো, আমার বাবা-মা কেউ তো নেই।
সুমন মিয়া জানান, আমার মায়ের বয়সের কাউকে দেখলেই কলিজাটা শান্ত হয়ে যায়। আমি ট্রেনে ট্রেনে, স্টেশনে আর হাটাবাজারে মাকে খুঁজি। আমি মাকে খুঁজে পাবো, তার জন্যই আপনিও একটা বড় হেডলাইন করে লিখে দিয়েন। মাকে খুঁজছি তিনি যেন সেই নিউজ দেখে আমাকে নিতে আসেন।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনে থাকেন সুমন মিয়া। সবার কাছে সহজ সরল ব্যক্তি হিসাবে সুমন পরিচিত। অন্যের উপকার করতে না পারলেও, সে কারো ক্ষতি করে না।
স্টেশন এলাকার আব্দুল রউফ দুদু জানান, সে জীবিকা নির্বাহের জন্য ফেরি করেন। তার আচার-আচরণও ভালো। নতুন বাজার এলাকা মোস্তফা কামাল বলেন, সুমন মিয়ার ঠিকানা কেউ জানে না। তবে একটু সময় পেলেই সে তার মায়ের কথা বলতে শুরু করে। সে তার মাকে খুঁজে পেতে চায়।
