প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের লক্ষ্যে সরকার স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম চালু করেছে। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীর জেলার কিশোরীগঞ্জ ও জলঢাকা উপজেলায় চলমান স্কুল ফিডিং বা মিড ডে মিল প্রকল্পের শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত মুনাফার ও গাফিলতিতে শিক্ষার্থীরা পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ উঠলেও স্থানীয়ভাবে কোনো তদন্ত টিম গঠন করা হয়নি।
বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকদিন ধরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চুক্তিবদ্ধ বেকারীতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির রুটি। সাপ্তাহিক রুটিনে পচা ডিম, বাসি রুটি ও কৃত্রিমভাবে পাকানো কলা দেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারীর ওই দুই উপজেলায় সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ইকো সোশ্যাল ডেভেলপম্যান্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) স্কুল ফিডিং কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সংস্থাটি কিশোরীগঞ্জ উপজেলার ১৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ হাজার ৩৩৪ জন ও জলঢাকা উপজেলার ২৪৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬ হাজার ৫৫৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে খাদ্য সরবরাহ করে আসছে। প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী, সপ্তাহে ৬ দিন রুটিন মোতাবেক রুটি, কলা, ডিম ও দুধ সরবরাহ করার কথা।
কিশোরীগঞ্জ উপজেলার ১ নম্বর উত্তর চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরঞ্জাবাড়ি বটতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা জানান, চুক্তিবদ্ধ সংস্থার একজন কর্মী ছোট-ছোট চাম্পা কলা সরবরাহ করে আসছে। কলাগুলোর মধ্যে অনেক কলা থেঁতলে গিয়ে কালো হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে কলাগুলো কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মীকে বলেন, কলাপ্রতি বরাদ্দ ৫ টাকা। তাই এর থেকে বড় কলা দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ সরকারিভাবে প্রতিপিস কলার বরাদ্দ ১০ টাকা ধরা রয়েছে।
উপজেলার চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরকবন প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাগুরা ইউনাইটেড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, তারা কোনো দিন পুরো খাবার পায় না। রুটির প্যাকেট ছিঁড়ে একটি করে রুটি, দুধের প্যাকেট কেটে এক কাপ দুধ ও ডিম কেটে অর্ধেক করে দেওয়া হয়। চাঁদখানা সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষার্থী রাজিয়া আক্তার বলে, ‘রুটিগুলো খুব শক্ত ও টক। তাই অনেক সময় তা খাই না।’
মাগুড়া ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনন্ত কুমার রায় বলেন, ‘আমাদের বরাদ্দ সংকট রয়েছে। তাই একজনের বরাদ্দ দিয়ে দুজনকে খাওয়াই।’
চাঁদখানা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আনিছুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পেয়ে একটি প্যাকেট খুলে দেখি রুটিগুলো শক্ত ও টক হয়ে গেছে। তাই শিক্ষার্থীরা খেতে অনীহা প্রকাশ করেছে।’
পুষণা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পুষণা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিনিয়ত নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হয়। কয়েকদিন আগে ওই স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পচা ডিম বিতরণ করা হয়। আমরা বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে অবহিত করি। বাচ্চারা এসব খাবার খেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই বিষয়টির তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।’
পুষণা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোর্শেদা বেগম ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পচা ডিম বিতরণের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।’
রুটির প্যাকেটের গায়ে দেখা যায়, স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে তৈরি করা রুটিগুলো নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের তৃপ্তি বেকারি থেকে উৎপাদন করা হয়েছে। সরেজমিন ওই বেকারীতে গিয়ে দেখা যায়, অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে শিশুদের জন্য তৈরিকৃত রুটিগুলো রাখা হয়েছে।
তৃপ্তি বেকারীর মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার সঙ্গে ওই সংস্থা কোনো চুক্তি করেনি। তারা আমার কাগজপত্র নিয়ে অন্য কারও সঙ্গে চুক্তি করেছে।’
ইকো সোশ্যাল ডেভেলপম্যান্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) জেলা ম্যানেজার ও প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামছুল আলম বলেন, ‘কিছু খাবারে সমস্যা হতে পারে। এ ব্যাপারে আমাদের সতর্ক ও সংশোধন করার সুযোগ দিন।’
কিশোরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমি বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়গুলো সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
