১৩ বছর আগে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকা-ের মামলার বিচারকাজে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন মামলার আসামি পুলিশের সাবেক ডিআইজি (উপ-মহাপরিদর্শক) আব্দুল জলিল মন্ডল। প্রয়োজনে এ মামলায় রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতেও রাজি আছেন তিনি। গতকাল বুধবার তার পক্ষে আইনজীবী মো. আলী হায়দার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তবে এখন পর্যন্ত রাজসাক্ষী হওয়ার কোনো আবেদন করা হয়নি বলে জানান আইনজীবী। এদিন মামলায় বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শাপলা চত্বর হত্যাকান্ডের মামলায় জামিনের আবেদন করেন জলিল ম-ল। তবে তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়। স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে এ জামিনের আবেদন করা হয়।
শাপলা চত্বরের ঘটনার সময় আব্দুল জলিল মন্ডল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ছিলেন। পরে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ অবসরে যান। গত ৩০ মার্চ রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে জলিল মন্ডলকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকান্ডের মামলার তদন্তে ওই ঘটনায় দেশের একাধিক জেলায় নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এ মামলার তদন্তকাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তদন্ত শেষে ট্রাইব্যুনালের নির্ধারিত আগামী ৭ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা হবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি আরও জানান, মামলার প্রধান আসামি করা হবে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এ ছাড়া মামলার আসামির সংখ্যা ৩০ জনের কম হবে না বলে জানান তিনি।
হেফাজতের সমাবেশে হত্যা মামলায় জলিল মন্ডল ছাড়াও লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) একেএম শহীদুল হক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান ও পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্লা নজরুল ইসলাম কারাগারে আছেন। গত বছরের ১২ মার্চ আসামি শেখ হাসিনা, ঘটনার সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজির আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল ট্রাইব্যুনাল।
প্রসঙ্গত, গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকান্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম রাজসাক্ষী হন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে সাক্ষ্য দেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের ফাঁসির রায় হয়। আর শর্তসাপেক্ষে রাজসাক্ষী হওয়া মামুনকে পাঁচ বছর কারাদ-াদেশ দেয় আদালত। কারাগারে থাকা মামুন এ সাজার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করেছেন। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের সময় সাভারের আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় রাজসাক্ষী হন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হক। এ মামলায় ছয়জনের ফাঁসির রায় হয়। আর আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া আবজালুল রায়ে ক্ষমা পান।
আব্দুল জলিল মন্ডলের আইনজীবী আলী হায়দার সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে (রাজসাক্ষী) কোনো লিখিত আবেদন দেওয়া হয়নি। জামিন আবেদনের বিষয়টি বিবেচনার জন্য একটি আবেদন করা হয়। আমরা ট্রাইব্যুনালে বলেছি ট্রাইব্যুনাল যদি অনুমতি দেন তাহলে বিচারকাজে প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে রাজি আছি। তিনি বলেন, ‘সহযোগিতা করতে গেলে ট্রাইব্যুনাল জানতে চাইবেন কীভাবে সহযোগিতা করব। প্রয়োজনে আমরা সাক্ষী (রাজসাক্ষী) হতেও রাজি আছি।’
আইনজীবী আলী হায়দার জানান, ক্লায়েন্টের (জলিল মন্ডল) সঙ্গে আমার সরাসরি কোনো কথা হয়নি। মূল আইনজীবী (অ্যাডভোকেট নুরুল হুদা আনসারী) তার (জলিল মন্ডল) সঙ্গে কথা বলে এ নির্দেশনা দিয়েছেন। মূল আইনজীবী আসামির সঙ্গে কথা বলেছেন, আর এর পরিপ্রেক্ষিতে আপনি বলেছেন যে, অ্যাপ্রুভার হতে চান সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে আইনজীবী বলেন, ‘যদি আদালত আমাদের অনুমতি দেয়। আমি চাইলেই তো হতে পারব না।’ ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে কিছু বলেছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কোর্ট এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।’
আসামিরপক্ষে আলী হায়দার বলেন, আসামি এমন কোনো কাজ করেননি যে, আইসিটি আইনে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা যায়। উনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন, ২০১৭ সাল পর্যন্ত চাকরি করে তিনি অবসরে গেছেন। ঘটনার পর কখনো দেশের বাইরে পালিয়ে যাননি। ২০২০ সাল থেকে তিনি অসুস্থ। তার হৃৎপিন্ডে সাতটি ব্লক রয়েছে।
২০১০ সালে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০১৩ সালের ৫ মে ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে মতিঝিল এলাকায় সমাবেশের ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। তবে সমাবেশ ঘিরে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই দিন মধ্যরাতে অভিযানে হেফাজতের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয় পুলিশ ও র্যাবের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। ঘটনার পর মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ ৬১ জন নিহতের তথ্য জানায়। তবে পুলিশের দাবি ছিল অভিযানে কেউ মারা যায়নি। দিনভর সংঘাতে ১১ জন নিহত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র- জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। একই বছরের ২০ আগস্ট শাপলা চত্বরের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯ জনের নামে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় একটি অভিযোগ জমা দেন হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা।
