দুই সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরল ১৬ প্রাণ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৯ এএম

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর ও বগুড়া সদরের এরুলিয়া এলাকায় পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ মোট ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩৩ জন।

গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টার দিকে ওসমানীনগরের খাশিকাপনে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৯ জন,  আহত হন ১৫ জন। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতদের মধ্যে একজন তরুণ বাউলসংগীতশিল্পী ও কয়েকজন পর্যটক রয়েছেন।

অন্যদিকে একই দিন সকালে বগুড়ার এরুলিয়ায় বাসচাপায় ৭ জন নিহত ও ১৮ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে আরও কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট ও বগুড়া প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদন

সিলেট : সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার খাশিকাপন নামক স্থানে সকাল ৭টার দিকে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীসূত্র জানায়, সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের (নং-ঢাকা মেট্রো ব-১৫-২৫৬৩) সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল পরিবহনের (নং-ঢাকা মেট্রো ব-১২-৫৯৮৭) মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলেই সাতজনের মৃত্যু হয়। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর শিশুসহ আরও দুজন মারা যান। নিহতরা হলেন কিশোরগঞ্জের লক্ষ¥ীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম (৫০), সিলেটের দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুলের ফাইজা (৩), সোবাহানীঘাটের সপ্তম রায় প্রিতম (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের বাউলসংগীতশিল্পী পেহেলী ভৈরবী (১৮), ব্রাম্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আবুল হোসেন (৪৪), কুমিল্লার মনরগঞ্জের আরমান হোসেন রাহিম (১৯), সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাইফুল ইসলাম ইমন (৩০)। একজনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে পুলিশ।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার মুক্তার মিয়া (৬০), যশোরের ওয়াহাব মিয়া (৩৫), কিশোরগঞ্জের ফারুক মিয়া (৫০), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আতিকুল ইসলাম (৪০), ফরিদপুরের শামীম আহমদ (৫০), ঢাকার মন্টু দাস (৩০), সুনামগঞ্জের রাজু দাস (৩৫), কুমিল্লার ইমরান হোসেন (৩৫), ঢাকার মনসুর আলী (৪০), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মফিজ মিয়া (৬৫), কিশোরগঞ্জের বাবুল মিয়া (৫০), ঢাকার নুরুন্নাহার বেগমসহ (৫০) অন্তত ১৫ জন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধারকাজে সহায়তা করেন। আহতদের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ওসমানীনগর থানার ওসি গোলাম মোস্তফা জানান, দুর্ঘটনার ভিডিওচিত্র দেখে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে দুটি বাসই খুব দ্রুতগতিতে চলছিল। হঠাৎ একটি পিকআপভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাস উল্টে সড়কের পাশে খাদে পড়ে যায় এবং বেঙ্গল পরিবহনের সামনের অংশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনায় হতাহত প্রায় সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী ছিলেন।    

শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি আনিসুর রহমান জানান, নিহতদের লাশ তাদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। আহতরা সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করেন। 

স্থানীয়রা জানান, মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে কান্না আর আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষ উদ্ধারকাজে সহায়তা করেন এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

উদ্ধারকাজে সহযোগিতাকারী এক ব্যক্তি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বলেন, ‘সকালে ভাইয়ের ডাকে ঘুম থেকে উঠি। পরে শুনি দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি অনেক মানুষ মারা গেছেন, অনেকে আহত হয়ে চিৎকার করছেন। আমরা সবাই মিলে বাস থেকে লাশগুলো বের করি। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরাও এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। মর্মান্তিক এ ঘটনা উপস্থিত সবাইকেই ব্যথিত করে।’   

দুর্ঘটনায় আহত কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ফারুক মিয়া (৫০) বর্তমানে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি জানান, দুদিন আগে তারা পাঁচ বন্ধু হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজার জিয়ারত ও সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো দেখতে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন বিমানে ঢাকায় ফিরে যান। ফারুক মিয়া ও তার অপর দুই বন্ধু ইউনিক পরিবহনের বাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ফারুক মিয়া বলেন, ‘বাসে ওঠার পর অনেকটা ঘুম চলে এসেছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। পরে আহতাবস্থায় আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়। দুর্ঘটনায় আমার বন্ধু সাইফুল ইসলাম নিহত হয়েছেন।’

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনীর জানান, ‘১৬ জনকে আহতাবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন। অন্যদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। আইসিইউতে রেখে তাদের চিকিৎসা চলছে।’ 

বাউল গানের অনুষ্ঠান শেষে ফিরছিলেন শিল্পী পেহেলী : সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশার ছাবাল শাহ মাজারের বাউল গানের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সিলেটে এসেছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের বাউলসংগীতশিল্পী পেহেলী ভৈরবী। অনুষ্ঠান শেষ করে শুক্রবার সকালে ইউনিক পরিবহনের বাসে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। পথে ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান উদীয়মান এ শিল্পী। পেহেলী ভৈরবী কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার কালু মিয়ার মেয়ে।

বগুড়া : বাস যাত্রী না হয়েও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা পড়লেন সাত শ্রমিক। বগুড়া সদরের এরুলিয়া এলাকায় ঢাকা থেকে নওগাঁগামী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকদের ওপর উঠিয়ে দেয়। এতে ঘটনাস্থলে তিনজন, হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনজন এবং চিকিৎসাধীন আরও একজন মারা যায়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৮ জন।

শুক্রবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে জেলা সদরের এরুলিয়া বাজার এলাকায় বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত সাতজন হলেন বগুড়া সদর উপজেলার ফাপোঁড় মধ্যপাড়ার বেল্লাল হোসেন (৪০), কাহালু উপজেলার নারহট্ট সরদারপাড়ার নুর মোহাম্মদ সরদার (৭৫), জয়পুরহাটের কালাই থানার মো. আনারুল ইসলাম (৫৫), পাঁচবিবি থানার আমিরুল (৪০), গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আবু সাঈদ (৪৫) ও নুর আলম (৪৫) এবং দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মো. তাজিমুল (৪৭)।

আহতরা বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন সকালে বগুড়া সদরের এরুলিয়া বাজারে দিনমজুর ও কৃষি শ্রমিকদের হাট বসে। এই হাটের অধিকাংশ দিনমজুর ও কৃষিশ্রমিকরা পাবনা, গাইবান্ধা ও রংপুর অঞ্চলের মানুষ। তারা দিনে বগুড়া সদরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিকাজসহ বিভিন্ন কাজ দিনমজুরির ভিত্তিতে করে থাকেন। কাজ শেষে রাতে স্থানীয় স্কুলের বারান্দায় তারা রাতযাপন করেন। এখানে প্রায় ৬০-৭০ জন শ্রমিক প্রতিদিন থাকেন। স্থানীয় লোকজন তাদের নিয়ে কাজ করাতেন। প্রতিদিনের ন্যায় শুক্রবার ভোরে এই শ্রমিকরা এসে এরুলিয়া বাজারে রাস্তার ধারে কাজের সন্ধানে দাঁড়িয়ে ছিল। সকাল পৌনে ৬টার দিকে ঢাকা থেকে নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের চাপা দেয়।

জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান আহতদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। এ সময় তিনি দুর্ঘটনায় নিহত পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে প্রদানের ঘোষণা দেন। এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন এবং তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এ দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা দাবি করেন, এ এলাকায় প্রায়ই এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে। তাই ওই এলাকায় যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিডব্রেকার দ্রুত স্থাপন করা জরুরি। এদিকে সড়ক ও জনপদ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, খুব দ্রুত ওই স্থানে একাধিক ডিভাইডার তৈরি করা হবে, যাতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা রোধ হয়।

প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ১

গতকাল সকালে সংঘটিত ভয়াবহ দুর্ঘটনার স্পট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বগুড়া বিমানবন্দর এলাকায় বিকেল ৪টায় প্রাইভেটকারের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মোটরসাইকেলচালক নিহত হন। তার পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলে থাকা একজন নারী ও এক শিশু গুরুতর আহত হয়েছেন। বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী জানান, আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

জানা যায়, মোটরসাইকেলটি শহর থেকে নওগাঁ অভিমুখে যাচ্ছিল। মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। তবে প্রাইভেটকারের সামনে ডান পাশের চাকা ফেটে গেলে ও সামনের অংশ ভেঙে গেলেও কেউ আহত হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত