মানিকগঞ্জে গ্রামীণ শক্তি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ২০০৯ সালে জনকল্যাণের অঙ্গীকার নিয়ে নিবন্ধিত হয়। তারা সমিতির সদস্যদের আবাসিক সুবিধা ও স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন করতে চায়। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই শুরু হয় সমিতির সভাপতি মাসুদ রানা ইন্তা ওরফে সাজেদুল হক ও তার স্ত্রী লিলি বেগমের প্রতারণা। সমিতির টাকা আত্মসাতের লক্ষ্যে বাবা-মায়ের নাম পাল্টে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্রও (এনআইডি) তৈরি করে মাসুদ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) করা অর্থ পাচার মামলার চার্জশিটে এই দম্পতিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাসুদ-লিলি দম্পতি গ্রামীণ শক্তির প্রায় ৭ বছরের (২০০৯ থেকে ২০১৫) কর্মকা-ে অন্তত এক হাজার মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এই সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে তারা ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া তারা মানিকগঞ্জে ৪৪৩.২৫ শতাংশ জামির মালিক বনে যান, যার দলিল মূল্য ৪ কোটি ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। আদালতের আদেশে তাদের সব জমি ক্রোক করে সিআইডি। তার আগেই অধিকাংশ জমিই হাতবদল করেছে প্রতারক মাসুদ। এসব জমি বর্তমানে ২৫ ব্যক্তি ভোগ-দখল করছেন।
সূত্র জানায়, প্রতারণার অর্থ আত্মসাৎ করতে বাবা ও মায়ের পরিচয় গোপন করে নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে মাসুদ। তার প্রকৃত নাম মাসুদ রানা ইন্তা, পিতা- মৃত বদর উদ্দিন ও মাতা- সাবজান বেগম, ঠিকানা- মানিকগঞ্জ সদর। কিন্তু প্রতারণা থেকে বাঁচতে মাসুদ আরেকটি নতুন এনআইডি কার্ড তৈরি করেন। যেখানে নিজের নাম রাখেন সাজেদুল হক, পিতা- মোহাম্মদ আজিজুল হক, মাতা- মনোয়ারা বেগম, ঠিকানা- জামালপুরের মাদারগঞ্জ। দুটি এনআইডিই জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে এখনও সক্রিয় রয়েছে। একজন ব্যক্তির কীভাবে দুটি এনআইডি কার্ড থাকতে পারেন, সেটা নিয়েই আশ্চর্য তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের ধারণা, নতুন কোনো পরিচয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন তারা।
একটি সূত্রে জানা যায়, এই দম্পতি নতুন করে জামালপুরের মাদারগঞ্জে ছদ্মবেশে বসবাস করছেন। তারা সেখানেও নতুন আরেকটি সমিতি খুলে একই ধরনের প্রতারণা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম ২০১৯ সালে মানিকগঞ্জে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় তারা গ্রেপ্তারও হন। এরপর জামিন নিয়ে বের হওয়ার পর এনআইডি কার্ড পরিবর্তন করে প্রতারণার নতুন জাল পেতে বসছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত দুই-এক বছর আগে ১০ থেকে ১৫টি সমিতি সক্রিয় ছিল। তারা একইভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা। বর্তমানে এলাকায় আর কোনো সমিতির সক্রিয় কার্যক্রম নেই।
মানিকগঞ্জ কোর্ট সূত্রে জানা যায়, মাসুদ-লিলি দম্পতি গ্রামীণ শক্তি সোসাইটির নিবন্ধন নেওয়ার পর মানিকগঞ্জ সদরসহ অন্যান্য উপজেলায় অফিস খুলে বসেন। তারা সাধারণ মানুষকে ডিপিএস, ফিক্সড ডিপোজিট ও ডাবল প্রফিট স্কিমসহ বিভিন্ন স্কিমে লাখপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মুনাফার প্রলোভন দেখান। ব্যাংক হিসাব খোলার মতো ফরম ও পাস বই দিতেন। এভাবে সমিতির সদস্য ৮৩৪ জন ছাড়াও সদস্য নয় এমন মানুষের কাছ থেকেও অর্থ হাতানো শুরু করেন। প্রতারণার ঘটনায় মানিকগঞ্জের বিভিন্ন থানায় সাতটি মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি অর্থপাচার আইনে একটি মামলা করে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। ওই মামলায় সিআইডি মানিকগঞ্জ আদালতে চার্জশিট দাখিল করছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে দুটি, ডাচ্-বাংলা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে পাঁচটি, ডাচ্-বাংলা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দুটি, জনতা ব্যাংকের একটি, অগ্রণী ব্যাংকের দুটি ও সিটি ব্যাংকের তিনটি হিসাব নম্বরে এই দম্পতির টাকা লেনদেন হয়। আদালত তাদের প্রতারণার অর্থে গড়ে তোলা ৪৪৩.৩৪ শতাংশ জমি ক্রোক করার আদেশ দেন। কিন্তু তার আগেই তারা অধিকাংশ জমি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি ও হস্তান্তর করে দিয়েছেন।
সূত্র আরও জানায়, মাসুদ তার স্ত্রীর সহযোগিতায় গ্রামীণ শক্তি সোসাইটির ফাঁদে ফেলে অন্তত এক হাজার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ ৮৯ হাজার ৫৪০ টাকা হাতিয়ে নেন। পরে এসব টাকা দিয়ে নিজ নামে সম্পত্তি ক্রয় করে আত্মসাৎ করেন। তদন্তে তার ব্যাংক হিসাবে ১১ কোটি ৫৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩১২ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তার দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস ছিল না। একইভাবে তার স্ত্রী গৃহিণী লিলি বেগমও ১ কোটি ৯০ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪০ টাকার মালিক হন।
একটি মামলার বাদী মজলিশ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রামীণ শক্তিতে ৮ লাখ টাকা জমা করি। মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে লাভ দেওয়ার কথা ছিল। সে হিসাবে তাদের কাছে সাড়ে ৩ লাখ টাকার মতো জমা হয়। সবমিলিয়ে তাদের কাচে ১১ লাখ ৫০ হাজার ৩৫ টাকা পাওনা রয়েছে। কিন্তু তারা সব টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের নামে মামলা করা হয়। আমরা প্রতারণার শিকার হয়ে পথে বসেছি। আমরা এর একটা সুরহা চাই।’
জমির মালিক মানিকগঞ্জের সিংগাইরের রুমান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার জমি মাসুদের কাছ থেকে কেনা না। তিনি কিনেছেন অন্য লোক থেকে। এ ছাড়া মাসুদের বাড়ি থেকে এই জমি ও মালিকের বাড়ি আরও দুই ইউনিয়ন পরে। লোকমুখে শুনেছি, এনজিওর মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে এই জমি কেনে তারা। পরে পুলিশ খোঁজ কারার পর এসব বিক্রি করে পালিয়েছেন তারা।
